
সবুজ পাতার ফাঁকে টুকটুকে লাল। দূর থেকে মনে হয় যেন সবে উঠেছে ভোরের সূর্য। কাছে গেলেই ভ্রম ভাঙে এটি সেই কিংবদন্তি আম, যার একটি জোড়া জাপানে একসময় বিক্রি হয়েছিল চার লাখ টাকায়। বিশ্বের সবচেয়ে দামি ফল মিয়াজাকি এখন বাংলাদেশের মাটিতে থোকায় থোকায় ঝুলছে।
নাটোর সদর উপজেলায় কৃষিবিদ মীর শাহীনুর রহমানের বাগান থেকে শুরু হয়ে এই আম এখন ছড়িয়ে পড়েছে পাহাড় থেকে সমতলে। গত এক দশকে তিনি দেশজুড়ে ৫০ হাজারের বেশি মিয়াজাকি চারা বিক্রি করেছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব বলছে, চলতি অর্থবছরে মিয়াজাকি উৎপাদনের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৩০ টন ২০১৯-২০ সালে যেখানে ছিল মাত্র পাঁচ টন।
শাহীনুরের গল্পটা শুধু একটি আমের নয়, এটি একজন মানুষের পছন্দের গল্প। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে যোগ দেন তিনি। সেই বছরই স্কলারশিপ পেয়ে পাড়ি জমান জাপানে। পড়াশোনা শেষে ২০০১ সালে ফেরেন দেশে। সামনে তখন খোলা আরেকটি দরজা যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে থাকার সুযোগ, স্ত্রীর ভিসাও প্রস্তুত। কিন্তু সে পথে হাঁটেননি তিনি। ফিরে এসেছিলেন নাটোরের মাটিতে।
নিজের পৈতৃক জমিতে গড়ে তোলেন 'কৃষিবিদ নার্সারি ও ফলবাগান'। শুরুটা ছিল কঠিন। রাজশাহী থেকে আনা আমের কলমের অধিকাংশই টক হয়ে গেল, কিছু মারাও গেল। চারদিক থেকে নিরুৎসাহের আওয়াজ উঠল। তবু থামেননি শাহীনুর।
২০১৪ সালে কৃষিবিদ ড. আমজাদের সহায়তায় জাপান থেকে আনা মাত্র পাঁচটি মিয়াজাকির সায়ান বা কলমের অংশ থেকে শুরু হয় বাংলাদেশের মিয়াজাকি অধ্যায়। তখন এই আমের নাম প্রায় কেউ জানতেন না, বাজারে কোনো পরিচিতিও ছিল না। শাহীনুর জানান, প্রথম দিকে কেউ চারা নিতে চাইত না। সবাই ভাবত, বিদেশি আম এদেশে টিকবে না। আম্রপালির ক্ষেত্রেও একসময় এমনই কথা উঠেছিল। এখন তো আম্রপালি সারা দেশে রাজত্ব করছে।
ধীরে ধীরে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে লাল রঙের সেই আমের ছবি। কৃষকদের আগ্রহ জন্মায়। ভিড় বাড়তে থাকে তাঁর নার্সারিতে।
জাপানের কিউশু দ্বীপের মিয়াজাকি অঞ্চলে জন্ম এই আমের। সূর্যের মতো আভা থাকায় জাপানিরা ডাকে 'তাইয়ো নো তামাগো' বাংলায় 'সূর্যডিম'। ২০১৯ সালে একটি আন্তর্জাতিক নিলামে এক জোড়া মিয়াজাকি আম বিক্রি হয় প্রায় পাঁচ হাজার মার্কিন ডলারে। ভারতেও গত বছর প্রতি কেজি আড়াই লাখ রুপিতে বিক্রির খবর ছড়িয়েছিল আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে।
বাংলাদেশে অবশ্য ছবিটা ভিন্ন। এখানে প্রতি কেজি মিয়াজাকি বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায়। শাহীনুর নিজে দুই বছর আগে পেয়েছিলেন কেজিতে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত। উৎপাদন বাড়ায় দাম এখন কমছে।
তিনি বলেন, জাপান আর বাংলাদেশের উৎপাদন ব্যবস্থা এক নয়। তাই দামও এক হবে না। জাপানে গ্রিনহাউসে, নির্দিষ্ট তাপমাত্রায়, প্রতিটি ফল হাতে বাছাই করে বাজারে আসে। এখানে সে পরিবেশ তৈরি হয়নি।
খাগড়াছড়ির মহালছড়িতে চার বছর ধরে মিয়াজাকি চাষ করছেন কৃষি উদ্যোক্তা হ্লাশিং মং চৌধুরী। এ বছর তাঁর বাগান থেকে উঠেছে প্রায় এক হাজার ২০০ কেজি আম। প্রতি কেজি ৬০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে বলে জানান তিনি। একই উপজেলার রিপল চাকমার বাগানেও রয়েছে অর্ধশতাধিক মিয়াজাকি গাছ। তাঁর মতে, এই আমের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মিয়াজাকিতে অন্য আমের তুলনায় পোকামাকড় ও মাছির আক্রমণ বেশি। প্রতিটি ফলে পর্যাপ্ত সূর্যালোক না পৌঁছালে আসল লাল রংটাই আসে না।
২০১৭ সাল থেকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর মিয়াজাকিকে বাণিজ্যিক চাষে উৎসাহিত করে আসছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশের আবহাওয়া ও মাটি এই আম চাষের জন্য মোটামুটি উপযোগী। তবে আন্তর্জাতিক মানের ফল উৎপাদনে চাই উন্নত ব্যবস্থাপনা, কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ এবং প্রিমিয়াম বাজার তৈরির উদ্যোগ।
বিদেশের সুযোগ ছেড়ে দেশের মাটিকে ভালোবেসেছিলেন শাহীনুর। সেই ভালোবাসাই আজ পাঁচটি সায়ান থেকে ৫০ হাজার চারায় রূপ নিয়েছে। জাপানের 'সূর্যডিম' এখন বাংলাদেশের আলোতে পেকে লাল হচ্ছে আর তাতে নতুন আশা জমছে হাজারো কৃষকের মনে।