
বিয়ে বা সামাজিক অনুষ্ঠানে ১০০ জনের বেশি অতিথি দাওয়াত দিলেই গুনতে হবে জরিমানা! শুনতে অবাক লাগলেও বাংলাদেশের আইনে ঠিক এমন একটি বিধানই রয়েছে। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে এই পুরোনো আইনটি নতুন করে আলোচনায় এনেছেন বিএনপির সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম।
গত ২২ জুন সংসদে তিনি বিয়ে ও গায়েহলুদের মতো অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত জাঁকজমক ও অপচয় রোধ করতে অতীত থেকে চলে আসা ‘অতিথি নিয়ন্ত্রণ আইন’ কঠোরভাবে কার্যকর করার আহ্বান জানান। কিন্তু কী আছে চার দশক পুরোনো এই আদেশে? চলুন জেনে নেওয়া যাক।
যে কারণে জারি হয়েছিল আদেশটি
দেশের সামগ্রিক খাদ্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং সামাজিক বা পারিবারিক অনুষ্ঠানে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের অপচয় রোধ করতে ১৯৮৪ সালের ৩ জুলাই একটি বিশেষ আদেশ জারি করে খাদ্য মন্ত্রণালয়। ১৯৫৬ সালের ‘দ্য কন্ট্রোল অব এসেনশিয়াল কমোডিটিজ অ্যাক্ট’-এর ক্ষমতাবলে জারি করা এই আইনটি ‘অতিথি নিয়ন্ত্রণ আদেশ, ১৯৮৪’ নামে পরিচিত।
আইনের প্রধান শর্ত: ১০০ জনের বেশি অতিথি নয় এই আদেশের সবচেয়ে বড় শর্ত হলো—বিয়ে, জন্মদিন, আকিকা বা যেকোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে ১০০ জনের বেশি অতিথিকে (আয়োজক পরিবারের সদস্য বাদে) ভাত বা গমের তৈরি কোনো খাবার পরিবেশন করা যাবে না।
বেশি অতিথি ডাকতে হলে যা করতে হবে বিশেষ কোনো প্রয়োজনে যদি ১০০ জনের বেশি অতিথিকে খাওয়াতেই হয়, তবে অনুষ্ঠানের আগেই সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক (DC) বা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (UNO) কাছ থেকে ‘ফরম-এ’ পূরণ করে লিখিত অনুমতি নিতে হবে। শুধু তা-ই নয়, ১০০ জনের পর অতিরিক্ত প্রত্যেক অতিথির জন্য সরকারি কোষাগারে ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে জনপ্রতি ২৫ টাকা (শুরুতে যা ছিল ১০ টাকা) ফি জমা দিতে হবে।
তদারকি ও শাস্তির বিধান নিয়মগুলো ঠিকমতো মানা হচ্ছে কি না, তা দেখার জন্য খাদ্য অধিদপ্তরের পরিদর্শক, পুলিশের গেজেটেড কর্মকর্তা বা ডিসি-ইউএনও মনোনীত যেকোনো সরকারি কর্মকর্তাকে অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ ও তল্লাশি করার আইনি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আইন অমান্য করলে অনুষ্ঠানের আয়োজক এবং কনভেনশন হল বা কমিউনিটি সেন্টারের মালিককে জরিমানা ও ক্ষেত্রবিশেষে কারাদণ্ড দেওয়ার বিধান রয়েছে।
ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ছাড় ও বর্তমান পরিস্থিতি পরবর্তীতে ২০০৩ সালে এই আইনে একটি সংশোধনী আনা হয়। মিলাদ মাহফিল, ইফতার, কুলখানি, চেহলাম বা শ্রাদ্ধের মতো বিশুদ্ধ ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোকে এই ১০০ অতিথির বাধ্যবাধকতা বা অতিরিক্ত ফি দেওয়ার আওতামুক্ত করা হয়।
আইনটি আনুষ্ঠানিকভাবে কখনো বাতিল করা হয়নি। তবে বর্তমানে যথাযথ প্রয়োগ এবং নজরদারির অভাবে এটি পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। আজকাল নামিদামি রেস্তোরাঁ বা কনভেনশন সেন্টারে হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে রাজকীয় আয়োজন হলেও, অনুমতি নেওয়া বা ফি দেওয়ার এই নিয়মটি আর চর্চায় নেই।