
আজ তাঁর নাম দেখলেই দর্শক হলে যান। জাতীয় পুরস্কার তাঁর ঝুলিতে। নির্মাতারা তাঁকে বিশ্বাস করেন। কিন্তু এই জায়গায় পৌঁছানোর পেছনে আছে এমন একটা গল্প, যা শুনলে বুকের ভেতরে একটা চিনচিনে অনুভূতি হয়। হচ্ছিল বলিউড অভিনেতা বিক্রান্ত ম্যাসির কথা।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তিনি নিজেই খুলে বললেন সেই দিনগুলোর কথা, যখন সফলতা ছিল শুধু স্বপ্নে, বাস্তবে ছিল কেবল টিকে থাকার লড়াই।
মুম্বাইয়ের মধ্যবিত্ত ছেলের বড় হওয়ার গল্প
মুম্বাইয়ের এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম বিক্রান্ত ম্যাসির। পরিবারে অর্থের প্রাচুর্য ছিল না, কিন্তু স্বপ্নের অভাবও ছিল না। কিন্তু স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে যে পরিশ্রম লাগে, সেটা তিনি বুঝেছিলেন অনেক কম বয়সে।
সমবয়সীরা যখন মাঠে ক্রিকেট খেলত, আড্ডায় মেতে থাকত, তখন বিক্রান্তের দিন কাটত ভিন্নভাবে। সংসারের আর্থিক টানাপোড়েন তাঁকে কৈশোরেই পরিণত মানুষ বানিয়ে দিয়েছিল।
১৬ বছরে শুরু হলো কর্মজীবন
বিক্রান্ত জানিয়েছেন, ১৬ বছর বয়সেই তিনি কাজ শুরু করেন। উদ্দেশ্য ছিল একটাই, নিজের পড়াশোনার খরচ চালানো এবং পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া। তিনি মুম্বাইয়ের একটি কফি শপে টেবিল পরিষ্কার করতেন।
বাইরে থেকে সহজ মনে হলেও এই কাজটি তাঁর কাছে ছিল আত্মসম্মান আর দায়িত্ববোধের কঠিন এক পাঠ। নিজেই বলেছেন, কোনো ১৬ বছরের ছেলে স্বেচ্ছায় এই পথ বেছে নেয় না। কিন্তু প্রয়োজনই তাঁকে বাধ্য করেছিল।
বন্ধুদের কাছে সত্য বলতে পারতেন না
এই সময়টা শুধু শারীরিক নয়, মানসিকভাবেও ছিল কঠিন। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় বন্ধুরা তাঁকে খেলতে ডাকত। কিন্তু বিক্রান্তের যেতে হতো কাজে। বন্ধুরা জিজ্ঞেস করত, কোথায় যাচ্ছ? তিনি স্পষ্ট করে বলতে পারতেন না। কারণ এত কম বয়সে পরিবারের জন্য কাজ করতে হচ্ছে, এই বিষয়টি তাঁকে বিব্রত করত।
আজ সেই লুকানোর কথা মনে পড়লে তাঁর বুকে কষ্ট হয়। কিন্তু স্বীকার করেন, সেই অভিজ্ঞতাই তাঁকে ভেতর থেকে শক্ত করেছে।
বয়স লুকিয়ে কাজ, মালিকও জানতেন
আরেকটি বিষয় বললে অবাক লাগে। তিনি তখন নাবালক। তাই কফি শপের মালিক তাঁকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন, বয়সের বিষয়টি যেন কেউ জানতে না পারে। বিক্রান্ত ও তাঁর নিয়োগকর্তা দুজনেই বয়স তিন বছর বেশি বলে পরিচয় দিতেন। তখনকার সেই বাস্তবতাই এটা ছিল।
প্রথম উপার্জন মাত্র ২০০ রুপি
অভিনয় থেকে তাঁর প্রথম আয়ও হয়েছিল স্কুলজীবনে। নিউজিল্যান্ডের একটি স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রতিষ্ঠানের ক্যাটালগের কাজে কয়েকজন শিক্ষার্থীর মধ্যে বিক্রান্তও নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেই কাজে পেয়েছিলেন মাত্র ২০০ রুপি। অর্থের পরিমাণ ছোট হলেও সেটিই ছিল তাঁর প্রথম উপার্জন। আর সেই ছোট্ট অনুভূতিই তাঁকে বুঝিয়ে দেয়, নিজের পরিশ্রমে অর্জনের মানে কী।
শিয়ামক দাভারের নাচের দল থেকে চলচ্চিত্রে
পরে তিনি যোগ দেন বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী শিয়ামক দাভারের দলে। সেখানে সমসাময়িক নৃত্যশিল্পী হিসেবে নিয়মিত পারিশ্রমিক পেতে শুরু করেন। নাচের পাশাপাশি অভিনয়ের প্রতিও তাঁর আগ্রহ বাড়তে থাকে। দিনভর কাজ, মহড়া, পড়াশোনা, সব মিলিয়ে জীবন ছিল ভীষণ ব্যস্ত।
সেই কফি শপে আসতেন চলচ্চিত্র জগতের নানা মানুষ। বিক্রান্তের মনে হতো, হয়তো একদিন তাঁদের কারও নজরে পড়বেন। হয়তো কোনো অভিনয়ের সুযোগ মিলবে। সেই স্বপ্নটাও তাঁকে প্রতিদিন টিকে থাকার শক্তি দিত।
বিমানসেবক না হয়ে অভিনেতা
অভিনয়ের আগে তিনি বিমানসেবক হওয়ার জন্যও চেষ্টা করেছিলেন। প্রাথমিক ধাপও পেরিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু ঠিক তখনই টেলিভিশনে অভিনয়ের সুযোগ এসে যায়। জীবনের মোড় ঘুরে গেল সেখান থেকেই।
ছোট পর্দায় ধারাবাহিকের মাধ্যমে ধীরে ধীরে দর্শকের কাছে পরিচিত হয়ে উঠলেন। দীর্ঘ সময় টেলিভিশনে কাজ করে অভিনয়ের ভিত্তি মজবুত করলেন।
টুয়েলভথ ফেল বদলে দিল সব
বলিউডে শুরু হয়েছিল ছোট ছোট চরিত্র দিয়ে। লুটেরা, আ ডেথ ইন দ্য গঞ্জ, ছপাক, হাসিন দিলরুবা, সেক্টর ৩৬, একটির পর একটি ছবিতে নিজেকে প্রমাণ করে গেছেন। তারপর এলো সেই মুহূর্ত, যার জন্য পুরো সংগ্রামটা সার্থক মনে হলো।
টুয়েলভথ ফেল শুধু বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়নি, সমালোচকদের কাছেও পেয়েছে উচ্চ প্রশংসা। একজন সাধারণ যুবকের স্বপ্নপূরণের গল্পে বিক্রান্তের অভিনয় দর্শকদের আবেগাপ্লুত করেছে। এই ছবির মাধ্যমেই তিনি জাতীয় পুরস্কার জিতেছেন।
২৪ বছরেই মায়ের স্বপ্ন পূরণ
মাত্র ২৪ বছর বয়সে নিজের উপার্জনের টাকায় একটি ছোট্ট বাড়ি কিনেছিলেন বিক্রান্ত। এটি ছিল তাঁর মায়ের বহুদিনের স্বপ্ন। তিনি বলেছেন, জীবনে যা-ই ঘটুক না কেন, অন্তত মাথা গোঁজার একটি জায়গা থাকবে, এই নিশ্চয়তাটাই তিনি তাঁর মাকে দিতে চেয়েছিলেন।
আজ সময় বদলেছে। যে ছেলে একসময় কলেজের ফি জোগাড় করতে সংগ্রাম করেছেন, তিনিই এখন স্ত্রীকে নিয়ে সন্তানের জন্য দেশের সেরা স্কুল বেছে নেওয়ার কথা ভাবছেন। বিক্রান্ত বলেছেন, জীবনের এই পরিবর্তন এখনো তাঁর কাছে অবিশ্বাস্য লাগে।