
আকাশ বা সড়কপথের ঝক্কি এড়িয়ে যারা একটু শান্তিতে প্রতিবেশী দেশ ভারতে যাতায়াত করতে পছন্দ করেন, তাদের অন্যতম প্রধান ভরসা ছিল রেল যোগাযোগ। কিন্তু দীর্ঘ প্রায় দুই বছর ধরে দুই দেশের মধ্যকার আন্তঃদেশীয় ট্রেন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশিদের জন্য ভারতের মেডিকেল ভিসার পাশাপাশি পর্যটন (ট্যুরিস্ট) ভিসাও চালু করা হয়েছে। এই ঘোষণার পর থেকেই সাধারণ যাত্রী ও পর্যটকদের মনে নতুন করে আশার আলো জেগেছে তবে কি আবারও লাইনে ফিরছে বাংলাদেশ-ভারত ট্রেন? কবে থেকে চালু হতে পারে এই বহুল প্রতীক্ষিত রেল সেবা?
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যোগাযোগের সুবর্ণ অধ্যায় রচনা করেছিল তিনটি যাত্রীবাহী ট্রেন মৈত্রী এক্সপ্রেস, বন্ধন এক্সপ্রেস এবং মিতালী এক্সপ্রেস।
মৈত্রী এক্সপ্রেস: ২০০৮ সালের ১৪ এপ্রিল দীর্ঘ ৪৩ বছর পর ঢাকা-কলকাতা রুটে এই ট্রেনের মাধ্যমে দুই দেশের যাত্রীবাহী রেল যোগাযোগ নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়।
বন্ধন এক্সপ্রেস: ২০১৭ সালের ৯ নভেম্বর চালু হওয়া এই ট্রেনটি খুলনা ও কলকাতার মধ্যে যাতায়াত করত।
মিতালী এক্সপ্রেস: সর্বশেষ ২০২১ সালের ২৭ মার্চ ভার্চ্যুয়ালি উদ্বোধন হওয়া এই ট্রেনটি ২০২২ সালের জুনে বাণিজ্যিকভাবে ঢাকা থেকে নিউ জলপাইগুড়ি (এনজেপি) রুটে চলাচল শুরু করে।
কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই মাসে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে সৃষ্ট সহিংসতার কারণে ধাপে ধাপে দেশের সব ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই মৈত্রী, ১৭ জুলাই বন্ধন এবং ১৮ জুলাই থেকে মিতালী এক্সপ্রেসের চাকা থমকে যায়। বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হলেও, বর্তমানে এই আন্তঃদেশীয় ট্রেনের ভারতীয় কোচ ও ওয়াগনগুলো ভারতে ফেরত নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ট্রেনগুলো পুনরায় চালু করার ব্যাপারে ভারতীয় রেলওয়েকে আগেই চিঠি পাঠানো হয়েছিল, তবে এখনো তার কোনো আনুষ্ঠানিক জবাব মেলেনি। যেহেতু এই বিষয়টি শুধু রেলপথ মন্ত্রণালয়ের একার সিদ্ধান্ত নয়; এর সাথে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সবুজ সংকেতেরও প্রয়োজন রয়েছে।
তবে সম্প্রতি রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব জানিয়েছেন যে, দুই দেশের মধ্যে ট্রেন চালুর বিষয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হতে পারে। আলোচনা ইতিবাচক হলে তবেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানা যাবে। এছাড়া আরেকটি গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে আগে মৈত্রী এক্সপ্রেস জয়দেবপুর ও যমুনা সেতু হয়ে চলাচল করলেও, এবার সেটি পদ্মা সেতু দিয়ে চালানো যায় কি না, তা নিয়ে আগামীর বৈঠকে আলোচনা হতে পারে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে ট্রেন চলাচল পুনরায় শুরু হওয়াটা কোনো রাজনৈতিক বিষয় নয়, বরং এটি সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক বাস্তবতা ও যাত্রী চাহিদার ওপর নির্ভরশীল।
ভিসা নীতি শিথিল হলে এবং পর্যটকদের যাতায়াত বাড়লে ট্রেনের যাত্রী সংখ্যা বাড়বে। কোনো দেশই লোকসান দিয়ে দীর্ঘদিন ট্রেন চালাতে চাইবে না। তাই ভিসা প্রক্রিয়া যত সহজ হবে, যাত্রী সংখ্যা যত বাড়বে, দুই দেশ ব্যবসায়িক প্রয়োজনেই ট্রেন চালু করতে তত বেশি আগ্রহী হবে।
যদি অদূর ভবিষ্যতে ট্রেন চালুও হয়, তবে যাত্রীদের পকেট যে আগের চেয়ে কিছুটা বেশি খালি হবে সেই আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ২০২৪ সালের জুনে ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে শেষবারের মতো এই তিন ট্রেনের ভাড়া বাড়ানো হয়েছিল, যা ছিল করোনা-পরবর্তী সময়ে পঞ্চম দফা বৃদ্ধি।
গত দুই বছরে বাংলাদেশে ডলারের দাম আরও ১৪ থেকে ১৫ টাকা বেড়েছে, সঙ্গে বৃদ্ধি পেয়েছে জ্বালানি তেলের দামও। রেল ভবনের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে, এই দীর্ঘ বিরতির পর যদি ট্রেন চলাচল শুরু হয়, তবে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে ভাড়া আরও একবার সমন্বয় (বৃদ্ধি) করা হতে পারে।
আপাতত ভারতের ট্যুরিস্ট ভিসা চালু হওয়াটাই পর্যটকদের জন্য স্বস্তির খবর। এখন দুই দেশের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক আলোচনা কতটা দ্রুত এগোয়, তার ওপরই নির্ভর করছে মৈত্রী, বন্ধন আর মিতালী এক্সপ্রেসের ট্র্যাকে ফেরার ভবিষ্যৎ।