
পবিত্র কোরআন কেবল একটি ধর্মীয় বিধিবিধানের গ্রন্থ নয়; বরং এটি মানবজাতির জন্য এক চিরন্তন আলোকবর্তিকা। এই মহাগ্রন্থে প্রায় ৭৫০টি এমন আয়াত রয়েছে, যা সরাসরি প্রাকৃতিক বিভিন্ন রহস্য নিয়ে আলোচনা করে এবং মানুষকে জ্ঞান অন্বেষণে নিরন্তর উদ্বুদ্ধ করে। আধুনিক বিজ্ঞান অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় আজ যেসব রহস্য উন্মোচন করছে, আজ থেকে চৌদ্দশ বছর আগে মরুভূমির তপ্ত বালুকাধামে অবতীর্ণ এক ঐশী গ্রন্থে সেই সত্যগুলোর সুনিপুণ বর্ণনা বিশ্ববাসীকে বিস্ময়ে বিমূঢ় করে দিচ্ছে।
পবিত্র কোরআনে বর্ণিত এমনই ১৩টি বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক তথ্যের ওপর আলোকপাত করা হলো:
১. জীবনের মূল উপাদান পানি: আধুনিক মাইক্রোস্কোপ আবিষ্কারের পর বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন যে, প্রতিটি জীবন্ত কোষের প্রধান উপাদান পানি। অথচ সুরা আল-আম্বিয়ার ৩০ নম্বর আয়াতে বহু আগেই বলা হয়েছে, ‘আমি প্রতিটি জীবন্ত বস্তুকে পানি থেকে সৃষ্টি করেছি।’
২. মহাবিশ্বের সৃষ্টি ও বিগ ব্যাং থিওরি: ১৯২৯ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানী এডউইন হাবল ‘বিগ ব্যাং’ তত্ত্বের ধারণা দেন। এর বহু আগে সুরা আম্বিয়ার ৩০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘অবিশ্বাসীরা কি দেখে না যে আসমান ও জমিন একত্রে মিলিত ছিল, অতঃপর আমি তাদের পৃথক করে দিলাম?’
৩. মহাবিশ্বের পরিণতি (বিগ ক্রাঞ্চ): বিজ্ঞানীরা মনে করেন মহাবিশ্ব একসময় সংকুচিত হয়ে আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। সুরা আম্বিয়ার ১০৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘সেদিন আমি আকাশকে গুটিয়ে নেব, যেভাবে লিখিত কাগজসমূহ গুটিয়ে রাখা হয়...।’
৪. মানব ভ্রূণতত্ত্ব: সুরা আল-মুমিনুনে (আয়াত: ১২-১৪) মাতৃগর্ভে মানুষের সৃষ্টির পর্যায়গুলো অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা আধুনিক ভ্রূণতত্ত্ববিদদেরও (Embryologist) হতবাক করেছে।
৫. বায়ুমণ্ডলের সুরক্ষাবলয়: বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, বায়ুমণ্ডল সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করে। সুরা আম্বিয়ার ৩২ নম্বর আয়াতে একে ‘সুরক্ষিত ছাদ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
৬. লোহার মহাজাগতিক উৎপত্তি: বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, লোহা পৃথিবীর নিজস্ব উপাদান নয়, এটি কোটি কোটি বছর আগে উল্কাপাতের মাধ্যমে পৃথিবীতে এসেছে। সুরা আল-হাদিদে (আয়াত: ২৫) বলা হয়েছে, ‘আমি লোহা অবতীর্ণ করেছি...।’
৭. দুই সমুদ্রের মিলন ও অদৃশ্য দেয়াল: ভিন্ন ভিন্ন ঘনত্বের কারণে দুই সমুদ্রের পানি একত্রে মিললেও তাদের মাঝে একটি অদৃশ্য বিভাজিকা থাকে, যা আধুনিক সমুদ্রবিজ্ঞানীদের যুগান্তকারী আবিষ্কার। সুরা আর-রাহমানে (আয়াত: ১৯-২০) এই অন্তরায়ের কথা স্পষ্ট উল্লেখ আছে।
৮. সূর্যের কক্ষপথ ও গতিশীলতা: একসময় বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল সূর্য স্থির। কিন্তু বিজ্ঞান এখন নিশ্চিত করেছে যে এটি নিজস্ব কক্ষপথে গতিশীল। সুরা আম্বিয়ার ৩৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, সূর্য ও চাঁদ ‘প্রত্যেকেই নিজ নিজ কক্ষপথে সাঁতার কাটছে।’
৯. পাহাড়ের ভূ-তাত্ত্বিক গঠন: সুরা আন-নাবায় (আয়াত: ৬-৭) পাহাড়কে ‘পেরেক বা খোঁটা’ স্বরূপ বলা হয়েছে, যা পৃথিবীর স্থিতিশীলতা বজায় রাখে। আধুনিক ভূতত্ত্ববিদ্যাও পাহাড়ের শেকড় মাটির গভীরে প্রোথিত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
১০. মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ: আধুনিক বিজ্ঞানীদের মতে মহাবিশ্বের প্রসারণ একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার। অথচ সুরা আজ জারিয়াতের ৪৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ নিজেকে ‘এর সম্প্রসারণকারী’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
১১. ত্বকের স্নায়ুকোষ (পেইন রিসেপ্টর): সুরা আন-নিসায় (আয়াত: ৫৬) জাহান্নামিদের চামড়া পুড়ে যাওয়ার পর নতুন চামড়া দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যাতে তারা আজাব ভোগ করতে পারে। বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, ব্যথার অনুভূতি কেবল মস্তিষ্কে নয়, বরং ত্বকের বিশেষ কোষেই থাকে।
১২. গভীর সমুদ্রের অভ্যন্তরীণ তরঙ্গ: সুরা আন-নুরে (আয়াত: ৪০) গভীর সমুদ্রের অন্ধকার ও ঢেউয়ের ওপর ঢেউ থাকার কথা বলা হয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞানীরাও সমুদ্রের তলদেশে শক্তিশালী তরঙ্গের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছেন।
১৩. মস্তিষ্কের সম্মুখভাগ (ফ্রন্টাল লোব): মানুষের মিথ্যা বলা বা মোটিভেশনের জন্য মস্তিষ্কের সম্মুখভাগ (প্রি-ফ্রন্টাল এরিয়া) দায়ী। সুরা আল-আলাকে (আয়াত: ১৫-১৬) পাপিষ্ঠদের ‘কপালের ঝুঁটি’ ধরে টানার কথা বলে মস্তিষ্কের ঠিক এই অংশটিকেই নির্দেশ করা হয়েছে।
উপসংহার: পবিত্র কোরআন মূলত কোনো বিজ্ঞানের বই নয়; এটি মানবজাতির হেদায়েতের কিতাব। তবে এতে থাকা এই নিখুঁত বৈজ্ঞানিক নিদর্শনগুলো অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, এই মহাগ্রন্থ কোনো মানুষের রচনা নয়, বরং এটি সর্বজ্ঞাতা মহান স্রষ্টার শাশ্বত বাণী।