
সকাল ঠিক দশটা। অফিসে ঢুকেই একের পর এক হাই তুলছেন তানিয়া। চোখ দুটো একদম লাল হয়ে আছে। পাশের টেবিলের সহকর্মী মুচকি হেসে বললেন, ব্রাজিল তো জিতে গেল, এবার আপনার ঘুমটা তাড়ান। তানিয়া শুধু একটা ক্লান্ত হাসি দিলেন। বাংলাদেশ সময় ভোর চারটার ম্যাচ দেখে একটুও না ঘুমিয়ে সরাসরি অফিসে চলে এসেছেন তিনি। অসুস্থতার বাহানা দিয়ে যে আজ একটা ছুটি নেবেন, সেই উপায়ও নেই। কারণ বিশ্বকাপের এই মৌসুমে করপোরেট বসেরা এমন হুটহাট ছুটি সহজে বিশ্বাস করতে চান না।
তানিয়ার এই ঘুম জড়ানো চোখের গল্প এখন বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি অফিসেরই চেনা ছবি। সুদূর আমেরিকায় বসা ফুটবলের বিশ্বমঞ্চ এ দেশের হাজারো কর্মজীবী মানুষের চেনা দৈনন্দিন জীবনকে উলটপালট করে দিয়েছে। মাঠে আমাদের নিজেদের কোনো দল নেই, হয়তো জলদি খেলার সুযোগও আসবে না। কিন্তু তা নিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের উন্মাদনায় কোনো কমতি নেই। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল কিংবা পর্তুগালের ম্যাচ নিয়ে লাঞ্চ রুম থেকে শুরু করে লিফট বা ক্যানটিন, সবখানেই এখন শুধুই ফুটবল আড্ডা।
তবে দল যা-ই হোক, এবারের বিশ্বকাপে চাকরিজীবীদের আসল প্রতিপক্ষ কোনো ফুটবল দল নয়, বরং ঘড়ির কাঁটা।
সময়ের পার্থক্যের কারণে বেশির ভাগ গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলো বাংলাদেশে যখন দেখায়, তখন গভীর রাত কিংবা ভোর। ফলে প্রতিদিন ঘুমাতে যাওয়ার আগে ফুটবলপ্রেমীদের মনে একটাই যুদ্ধ চলে, ঘুমাবেন নাকি প্রিয় দলের খেলা দেখবেন? বেশির ভাগ মানুষ আবেগের টানে ঘুমের সঙ্গেই আপস করছেন। আর তার খেসারত দিতে হচ্ছে পরদিন সকালে অফিসের ডেস্কে বসে।
তাই সকাল থেকেই অফিসগুলোতে এখন এক নতুন দৃশ্য। কেউ মগ ভর্তি কড়া কফি খাচ্ছেন, কেউ বা পর পর কয়েক কাপ চা খেয়েও ঘুম তাড়াতে পারছেন না। অনেকে আবার সকালের মিটিংয়ে কায়দা করে ক্যামেরা বন্ধ রাখছেন যাতে হাই তোলার দৃশ্য ধরা না পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এখন রাতের গোলের আনন্দের পাশাপাশি সকালে অফিসে টিকে থাকার নানা ‘নিনজা টেকনিক’ নিয়ে বেশ রসাত্মক আলোচনা চলছে।
রাত জাগার এই প্রভাব যে শুধু আমাদের দেশেই পড়ছে, তা কিন্তু নয়। বিশ্বজুড়ে বড় টুর্নামেন্টের সময় কর্মীদের ঘুম কম হওয়া এবং কাজে মনোযোগ হারানোর বিষয়টি নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। এই বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে বিশ্বের অনেক আধুনিক প্রতিষ্ঠান তাদের কাজের নিয়মে কিছুটা নমনীয়তা এনেছে। তারা ম্যাচের পরের দিন কর্মীদের একটু দেরিতে আসার সুযোগ দিচ্ছে কিংবা বাসা থেকে কাজ করার সুবিধা করে দিচ্ছে। উদ্দেশ্য একটাই, কর্মীর ফুটবল আবেগকেও সম্মান জানানো এবং কাজের গতিও ঠিক রাখা।
আমাদের দেশেও এখন করপোরেট সংস্কৃতিতে অনেক বদল আসছে। শুধু ঘড়ির কাঁটার হিসাব না করে কর্মীর কাজের ফলাফলের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। চার বছর পর পর আসা এই ফুটবল উৎসবের দিনগুলোতে কর্মীদের কাজের উদ্যম ধরে রাখতে আমাদের দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোও কি এমন নমনীয়তার কথা ভেবে দেখতে পারে না?
তবে অফিস ছুটি দিক বা না দিক, শরীর সুস্থ রেখে কাজ করাটা কিন্তু সম্পূর্ণ নিজের দায়িত্ব।
ম্যাচ বেছে নিন: প্রতিদিনের সব ম্যাচ লাইভ দেখার কোনো প্রয়োজন নেই। শুধু নিজের প্রিয় দল অথবা নকআউটের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোর জন্য রাত জাগুন।
ছোট ঘুম বা পাওয়ার ন্যাপ: রাতে খেলা দেখতে হবে জানা থাকলে সন্ধ্যার সময় অন্তত তিরিশ মিনিটের একটা ছোট্ট ঘুম দিয়ে নিন। এতে রাতের ক্লান্তি কিছুটা কমবে।
পানির বিকল্প নেই: সকালে ক্যাফেইনের ওপর অতিরিক্ত ভরসা না করে পর্যাপ্ত পানি পান করুন। আর সকালের ভারী নাস্তা কোনোভাবেই বাদ দেবেন না।
কাজের তালিকা সাজান: অফিসে গিয়েই দিনের সবচেয়ে কঠিন এবং বেশি মনোযোগের কাজগুলো দুপুরের আগেই শেষ করে ফেলুন। কারণ দুপুরের পর ক্লান্তি বেশি ভর করতে পারে।
ছোট্ট বিরতি: দুপুরের খাবারের পর ডেস্ক ছেড়ে একটু হাঁটাহাঁটি করুন অথবা মিনিট দশেকের জন্য চোখ বন্ধ করে বিশ্রাম নিন।
সামনে যত নকআউট পর্ব আসবে, মাঠের উত্তেজনার সঙ্গে সঙ্গে সকালের ক্লান্তি আর হাই তোলার সংখ্যাও হয়তো বাড়বে। কিন্তু দিন শেষে অফিসের পাঞ্চিং মেশিনে আঙুল আমাদের ছোঁয়াতেই হবে। কারণ মাঠের ফুটবল যুদ্ধ নব্বই মিনিটেই শেষ হয়ে যায়, কিন্তু মধ্যবিত্ত চাকরিজীবীদের টিকে থাকার আসল ম্যাচটা চলে মাসের শেষ দিন পর্যন্ত।