
দেশের ব্যাংকিং খাতে এক অভাবনীয় সাফল্য দেখাল বেসরকারি খাতের অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান পূবালী ব্যাংক। দেশের ইতিহাসে পঞ্চম এবং বেসরকারি খাতের দ্বিতীয় ব্যাংক হিসেবে আমানতের পরিমাণ এক লাখ কোটি টাকার অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে তারা। গ্রাহকদের অবিচল আস্থা, চমৎকার সুশাসন ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সেবার ওপর ভর করে এই ঐতিহাসিক অর্জন সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যাংকটির নীতিনির্ধারকেরা।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহের শেষ দিকে পূবালী ব্যাংকের মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮০০ কোটি টাকা। এর মাধ্যমে দেশের ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ১ লাখ কোটি টাকার আমানতের ক্লাবে যুক্ত হলো প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে এই তালিকায় থাকা অন্য চারটি ব্যাংক হলো সোনালী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক এবং জনতা ব্যাংক।
২০১৬ সালে দেশের প্রথম ব্যাংক হিসেবে এই মাইলফলক স্পর্শ করেছিল রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক। পরবর্তীতে ২০২০ সালে বেসরকারি খাতের প্রথম ব্যাংক হিসেবে ইসলামী ব্যাংক এই তালিকায় আসে। ২০২১ সালে অগ্রণী ও জনতা ব্যাংক এই গৌরব অর্জন করে। আর চলতি বছরের জুলাইয়ে পূবালী ব্যাংক সর্বশেষ সদস্য হিসেবে এই তালিকায় নিজের নাম লেখাল।
পূবালী ব্যাংকের এই আমানত বৃদ্ধির গতি সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। ২০২২ সালের শেষের দিকেও ব্যাংকটির মোট আমানত ছিল প্রায় ৫১ হাজার কোটি টাকা। সেখান থেকে মাত্র সাড়ে তিন বছরের ব্যবধানে তা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। গত বছরের শেষ দিকে যেখানে আমানত ছিল ৮৯ হাজার ৫১৯ কোটি টাকা, সেখানে মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে তা বড় অঙ্কের প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে।
১৯৫৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর প্রথম ৬৩ বছরে ব্যাংকটি যে পরিমাণ আমানত সংগ্রহ করেছিল, ঠিক সমপরিমাণ আমানত যুক্ত হয়েছে গত সাড়ে তিন বছরে। ব্যাংকিং খাতে এটিকে একটি বিরল ও বড় ধরনের অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ১৯৫৯ সালে ‘ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংক’ নামে এই যাত্রা শুরু হয়েছিল। স্বাধীনতার পর ১৯৭১ সালে এটিকে সরকারি মালিকানায় নিয়ে ‘পূবালী ব্যাংক’ নাম দেওয়া হয়। তবে সরকারি ব্যবস্থাপনায় থাকার সময় ঋণ জালিয়াতি ও দুর্বল নজরদারির কারণে ১৯৮৪ সালের মধ্যে ব্যাংকটির বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৫৪ শতাংশই খেলাপি হয়ে পড়ে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ১৯৮৪ সালে সরকার মাত্র ১৬ কোটি টাকার বিনিময়ে ব্যাংকটিকে আবার বেসরকারি খাতে ফিরিয়ে দেয়। পূর্বের উদ্যোক্তাদের হাতে মালিকানা ফিরে আসার পর শুরু হয় ব্যাপক সংস্কার। আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ কর্মী এবং শক্তিশালী ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ব্যাংকটি ধীরে ধীরে লোকসান কাটিয়ে আজকের এই শক্তিশালী অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে।
শুধু আমানত সংগ্রহেই নয়, অন্যান্য আর্থিক সূচকেও বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে পূবালী ব্যাংক। বর্তমানে ব্যাংকটির মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ প্রায় ৭৪ হাজার কোটি টাকা। যেখানে দেশের পুরো ব্যাংকিং খাতে গড় খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩০ শতাংশের কাছাকাছি, সেখানে পূবালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ মাত্র ২ দশমিক ২০ শতাংশ। সম্পদের সঠিক ব্যবস্থাপনা ও নিখুঁত ঋণ নীতির কারণেই এটি সম্ভব হয়েছে।
পাশাপাশি, গত বছর ব্যাংকটি নিট মুনাফা করেছে ১ হাজার ৭৯ কোটি টাকা, যা দেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। এছাড়া দেশের আমদানি, রপ্তানি ও প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স আনয়নের ক্ষেত্রেও ব্যাংকটি বড় অবদান রেখে চলেছে।
দেশজুড়ে পূবালী ব্যাংকের বর্তমানে ৫১৯টি শাখা ও ২৯০টি উপশাখা রয়েছে। এর পাশাপাশি এক হাজারের বেশি এটিএম এবং সিআরএম বুথ সেবা দিচ্ছে। তবে ব্যাংকটির এই দ্রুত প্রসারের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে তাদের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম।
ব্যাংকটির নিজস্ব মোবাইল অ্যাপ ‘পাই’ বর্তমানে প্রায় ৬ লাখ গ্রাহক ব্যবহার করছেন। ঘরে বসেই মাত্র কয়েক মিনিটে অ্যাকাউন্ট খোলার আধুনিক সুবিধার কারণে নতুন প্রজন্মের গ্রাহকেরা এই ব্যাংকের প্রতি দারুণভাবে আকৃষ্ট হচ্ছেন। দেশজুড়ে তাদের ২৫ হাজারের বেশি মার্চেন্ট পিওএস টার্মিনাল এবং প্রায় দেড় লাখ বাংলা কিউআর কোড রয়েছে, যা ক্যাশলেস লেনদেনকে আরও সহজ করেছে।
পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী জানান, গ্রাহকদের দীর্ঘদিনের বিশ্বাস ও ভালোবাসাই তাদের এই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। দেশব্যাপী বিস্তৃত নেটওয়ার্ক এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে তারা আগামী দিনেও এই প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখতে শতভাগ প্রস্তুত।