
দেশের খুচরা ও পাইকারি খাতে প্রায় ৭৫ লাখ ব্যবসায়ী রয়েছেন। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে বছরে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা ভ্যাট আদায়ের সম্ভাবনা রয়েছে। অথচ এনবিআর আদায় করতে পারছে মাত্র ৫ হাজার কোটি টাকা, যা সম্ভাব্য রাজস্বের মাত্র ৩ শতাংশ! অর্থাৎ সাধারণ ভোক্তারা কেনাকাটায় শতভাগ ভ্যাট পরিশোধ করলেও তার ৯৭ শতাংশই সরকারি কোষাগারে জমা না হয়ে অসাধু ব্যবসায়ীদের পকেটে চলে যাচ্ছে।
প্যারালাল বিলিং: অভিনব প্রতারণা
ভ্যাট চুরির সবচেয়ে ভয়াবহ কৌশল হলো ‘প্যারালাল বিলিং’। অসাধু ব্যবসায়ীরা নিজেদের হিসাবরক্ষণ সফটওয়্যার ব্যবহার করে হুবহু এনবিআরের ইএফডি রসিদের মতো দেখতে নকল রসিদ ক্রেতাদের ধরিয়ে দিচ্ছেন। এই রসিদে ভ্যাটের পরিমাণ লেখা থাকলেও এনবিআরের কিউআর (QR) কোড থাকে না। এছাড়া অনেক বিলাসবহুল রেস্তোরাঁ ও সুপারশপে ইএফডি মেশিন থাকলেও ‘সার্ভার ডাউন’ বা ‘ইন্টারনেট নেই’ অজুহাতে তা বন্ধ রাখা হয়।
প্রকল্পে বিপুল ব্যয়, সুফল শূন্য
গত দেড় দশকে ভ্যাট অটোমেশনের নামে ইসিআর ও ইএফডি প্রকল্পের পেছনে ৩৪৭ কোটি টাকার বেশি ব্যয় করেছে এনবিআর। সর্বশেষ ২০২২ সালে ‘জেনেক্স ইনফোসিস’-এর সঙ্গে ৫ বছরে ৩ লাখ ইএফডি মেশিন বসানোর চুক্তি হয়। কিন্তু দুই বছর পেরিয়ে গেলেও মাত্র ১৫ হাজার মেশিন স্থাপন করা সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগ মেশিনই এখন অকার্যকর। ক্রেতাদের উৎসাহিত করতে চালু করা ‘ইএফডি লটারি’ও কোনো সাড়া ফেলতে না পারায় শেষ পর্যন্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
১০ হাজার টাকার প্রহসনের জরিমানা
এনবিআরের নিয়ম অনুযায়ী, ইএফডি ব্যবহার না করলে বা রসিদ না দিলে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার ভ্যাট ফাঁকি দেওয়া বড় বড় প্রতিষ্ঠানের কাছে এই জরিমানা রীতিমতো প্রহসন। তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের যোগসাজশেই এই দুর্নীতি প্রশ্রয় পাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মত: সুশাসন ও প্রযুক্তির ঘাটতি
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ই-ইনভয়েসিং ও রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে ভ্যাট আদায়ে বৈপ্লবিক সাফল্য পেলেও বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, কেবল যন্ত্র বসালেই হবে না; এর জন্য সুশাসন ও আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের (এআই) মতো উন্নত প্রযুক্তির সমন্বয় দরকার ছিল।
অন্যদিকে, কর বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীষ বড়ুয়া মনে করেন, খুচরা পর্যায়ে বেশি ভ্যাটের হার ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই তারা ইএফডি এড়িয়ে নগদ লেনদেনেই বেশি আগ্রহী হচ্ছেন। এআই ক্যামেরা ও ই-ইনভয়েসিংয়ের কার্যকর সমন্বয় ছাড়া এই বিশাল অঙ্কের রাজস্ব ফাঁকি রোধ করা অসম্ভব।