
বিশ্বকাপের বছর এলেই ফুটবল বিশ্বের সব হিসাব ওলটপালট হয়ে যায়। পুরো মৌসুম জুড়ে কে কেমন খেলেছেন, তার চেয়েও অনেক সময় বড় হয়ে দাঁড়ায় বিশ্বকাপের পারফরম্যান্স। ২০২৬ বিশ্বকাপের পর্দা নামার পরও ঠিক তেমনই এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। স্পেনের ট্রফি জয়ের পর ফুটবলের সবচেয়ে প্রেস্টিজিয়াস ব্যক্তিগত পুরস্কার 'ব্যালন ডি’অর' জয়ের দৌড়ে বেশ বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
স্প্যানিশ দৈনিক মার্কার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ফুটবলের শীর্ষ এই সম্মানের দৌড়ে এই মুহূর্তে ছয়জন তারকা বেশ শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। তারা হলেন রদ্রি, লামিনে ইয়ামাল, লিওনেল মেসি, হ্যারি কেইন, কিলিয়ান এমবাপ্পে এবং উসমান দেম্বেলে। তবে এদের মধ্যে স্পেনের দুই তারকাকে নিয়ে ফুটবলপাড়ায় সবচেয়ে বেশি আলোচনা চলছে।
গুরুতর ইনজুরি কাটিয়ে এই মৌসুমে মাঠে ফিরেছিলেন রদ্রি। ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে পুরো মৌসুমে দারুণ খেললেও বিশ্বকাপের মঞ্চে তিনি ছিলেন এক কথায় অসাধারণ। টুর্নামেন্টজুড়ে স্পেনের মিডফিল্ড এক হাতে সামলে জিতে নিয়েছেন টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার। বিগত ছয় দশকের মধ্যে এক বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি বল টাচ, নিখুঁত পাস এবং আক্রমণভাগে বল সরবরাহের অনন্য রেকর্ড এখন তার দখলে। পুরো টুর্নামেন্টে স্পেন মাত্র একটি গোল হজম করেছে, যার পেছনেও এই অভিজ্ঞ মিডফিল্ডারের ভূমিকা ছিল অপরিসীম।
মাত্র ১৯ বছর বয়সেই ফুটবলের বিস্ময় বালক হিসেবে নিজেকে চেনিয়েছেন লামিনে ইয়ামাল। বার্সেলোনার হয়ে মৌসুমে ২৪টি গোল এবং ১৭টি অ্যাসিস্ট করে জিতেছেন লা লিগা ও স্প্যানিশ সুপার কাপ। এরপর বিশ্বকাপেও তিনি ছিলেন স্পেনের আক্রমণের মূল ভরসা। সর্বোচ্চ ড্রিবলিংয়ের পাশাপাশি সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ পেনাল্টি আদায় করে নেওয়া, সবমিলিয়ে ক্লাব ও দেশের হয়ে তার এই অর্জন ব্যালন ডি’অরের দৌড়ে তাকে বেশ শক্ত প্রতিযোগী করে তুলেছে।
বয়স ৩৯ ছুঁলেও মাঠের জাদুতে এখনো ভক্তদের মুগ্ধ করে চলেছেন লিওনেল মেসি। আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরতে না পারলেও মেসি দলকে টেনে তুলেছিলেন ফাইনাল পর্যন্ত। টুর্নামেন্টে ৮টি গোল এবং ৪টি অ্যাসিস্ট করে নিজের জাত চিনিয়েছেন তিনি। ট্রফি জিতলে নবম ব্যালন ডি’অর পকেটে পুরতেন এবং ইতিহাসের সবচেয়ে বয়স্ক বিজয়ী হতেন। কিন্তু ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে দল গোল করতে না পারায় তার ঝুলিতে ট্রফিটি না ওঠায় লড়াইয়ে কিছুটা পিছিয়ে পড়েছেন তিনি।
বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে ৩৬টি গোল করে লিগ ও কাপের ডাবল জিতেছেন হ্যারি কেইন। বিশ্বকাপে ৬টি গোল করার মাধ্যমে ইংল্যান্ডের হয়ে বড় কোনো টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডও ভাঙেন তিনি। নিজের ক্যারিয়ারের সেরা মৌসুম কাটানোয় কেইনকেও এই লড়াই থেকে বাদ দেওয়া যাচ্ছে না।
চ্যাম্পিয়নস লিগ ও লা লিগায় সর্বোচ্চ গোলদাতার পাশাপাশি ১০ গোল করে বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুট জিতে নিয়েছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের বিচারে তার মৌসুমটি দারুণ কাটলেও দলগত ট্রফির ঝুলি একবারে ফাঁকা। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে কোনো শিরোপা পাননি এবং ফ্রান্সের সফরও থমকে গেছে সেমিফাইনালে। ফলে একক নৈপুণ্য দেখালেও ট্রফির অভাবে বেশ ব্যাকফুটে আছেন তিনি।
গতবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী উসমান দেম্বেলে চোটের কারণে অনেকটাই আড়ালে ছিলেন। তবে পিএসজির হয়ে ২২ ম্যাচে ১০ গোল করে দলকে চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতাতে বড় ভূমিকা রাখেন। বিশ্বকাপে ফ্রান্সের হয়ে হ্যাট্রিকসহ ৬টি গোল করলেও দল চ্যাম্পিয়ন না হওয়ায় তার জেতার সম্ভাবনা কিছুটা কম।
বিশ্বকাপের ট্রফি জিতলেই যে ব্যালন ডি’অর হাতের মুঠোয় চলে আসে, তা কিন্তু নয়। অফিশিয়াল নিয়ম অনুযায়ী পুরো মৌসুমের পারফরম্যান্সই আসল বিবেচ্য বিষয়। তবুও বৈশ্বিক এই আসরে স্পেনের সাফল্যের পর রদ্রি ও লামিনে ইয়ামাল যে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছেন, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
সব জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটবে আগামী ২৬ অক্টোবর, লন্ডনে জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে জানা যাবে ২০২৬ সালের সেরা ফুটবলারের নাম।