
প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) প্রক্রিয়া দ্রুত করা, বহুজাতিক কোম্পানিকে বাজারে আনা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ভিত্তিক নজরদারিসহ বহুমুখী সংস্কার উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান মাসুদ খান।
স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ ও বাজারের গতিশীলতা দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) আইনি ক্ষমতা বাড়িয়েছে নতুন কমিশন। অস্বাভাবিক লেনদেন রোধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের গলার কাঁটা ‘ফ্লোর প্রাইস’ তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত বাজারে এরই মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
লেনদেনে গতিশীলতা আনতে ‘টি প্লাস ওয়ান’ সেটেলমেন্ট এবং ‘স্ক্রিপ নেটিং’ পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাজেটে ব্যক্তি পর্যায়ের ডিভিডেন্ড ট্যাক্স কমিয়ে ১৫ শতাংশে আনা এবং বন্ডের মুনাফাকে করমুক্ত রাখার মতো যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বড় কোম্পানিগুলোকে বাজারে আনার কড়াকড়ি দেশের পুুঁজিবাজারে মেটলাইফ বা স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের মতো বহুজাতিক কোম্পানি ও বড় দেশি শিল্পগোষ্ঠীর অনুপস্থিতি দীর্ঘদিনের আক্ষেপ। ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়া এসব কোম্পানিকে এখন পাবলিক ইন্টারেস্ট কোম্পানি (পিআইসি) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার পরিকল্পনা করছে বিএসইসি।
ব্যাংক থেকে নির্দিষ্ট সীমার বেশি ঋণ নিলে বা বার্ষিক টার্নওভার একটি নির্দিষ্ট সীমা পার করলে, এসব কোম্পানিকে বাধ্যতামূলকভাবে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির আবেদন করতে হবে।
সমন্বয়হীনতা দূর ও ব্রোকারেজ হাউজে কড়া নজরদারি অতীতে বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা বাজারের বড় ক্ষতি করেছে। এটি সমাধানে বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর এবং আইডিআরএ’র সঙ্গে প্রতি তিন মাস অন্তর শীর্ষ পর্যায়ে বৈঠকের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিনিয়োগকারীদের অর্থ লুটের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে ডিএসইকে নজরদারি বাড়ানোর কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ ব্রোকারেজ হাউজগুলোকে চিহ্নিত করে এখন থেকে ঘন ঘন পরিদর্শনের (ইন্সপেকশন) আওতায় আনা হবে।
প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ ও ফান্ডের সুরক্ষা বর্তমানে দেশের পুঁজিবাজারে প্রায় ৯০ শতাংশই ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী, যা বাজারের স্থিতিশীলতার জন্য বড় ঝুঁকি। এই ঝুঁকি কাটাতে মিউচুয়াল ফান্ড খাতকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে। পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে ফান্ডের কেন্দ্রীয় গ্রেডিং করা হবে।
পাশাপাশি দেশের বিশাল প্রভিডেন্ট ও গ্রাচুইটি ফান্ডগুলোকে পুঁজিবাজারে আনার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। এসব ফান্ডের অন্তত ১০ শতাংশ মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের জন্য কোটা রাখার পরিকল্পনা চলছে।
আইপিও অনুমোদন ৬০ দিনে, আসছে ইটিএফ ও আরইআইটি আগামী দুই-তিন বছরে বাজারের গভীরতা বাড়াতে ডাইরেক্ট লিস্টিং প্রক্রিয়া সহজ করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে আইপিও অনুমোদন প্রক্রিয়াকে ঢেলে সাজিয়ে ৬০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা নিয়েছে কমিশন।
বাজারকে ইমার্জিং মার্কেটে উন্নীত করতে ডেরিভেটিভ মার্কেট, এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড (ইটিএফ) এবং রিয়েল এস্টেট ইনভেস্টমেন্ট ট্রাস্ট (আরইআইটি) চালুর চিন্তাভাবনা চলছে। কারসাজি রোধে পুরো নজরদারি ব্যবস্থাকে স্বয়ংক্রিয় ও এআইভিত্তিক করা হচ্ছে।
বিনিয়োগকারীদের প্রতি বিশেষ বার্তা ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, "হাই গেইন মানে হাই রিস্ক। এক সপ্তাহের মধ্যে টাকা দ্বিগুণ করার প্রবণতা থাকলে পুঁজি হারানোর ঝুঁকি থাকবেই।"
রাতারাতি বড়লোক হওয়ার চিন্তা পরিহার করে দীর্ঘমেয়াদি ও মৌলভিত্তি-সম্পন্ন শেয়ারে বিনিয়োগের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। কোম্পানি সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে বিনিয়োগ করলেই কেবল বাজারের প্রকৃত সুফল পাওয়া সম্ভব।