
জুলাই-আগস্টের রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানে যারা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছেন, তাদের সেই অসামান্য আত্মত্যাগ কোনোভাবেই বৃথা যেতে দেওয়া হবে না বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, শহীদদের এই রক্তের ঋণ শোধ করার একমাত্র উপায় হলো দেশে নিরঙ্কুশ গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার এবং জনগণের দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্রিক পরিবর্তন নিশ্চিত করা।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) রাজধানীর সার্কিট হাউস রোডে অবস্থিত ডিএফপি অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এক প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বক্তব্যের শুরুতেই মির্জা ফখরুল বলেন, সমাজে বড় কোনো পরিবর্তন কখনোই রাতারাতি বা হঠাৎ করে আসে না। একটি নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন, নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম এবং প্রয়োজনে সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই চূড়ান্ত পরিবর্তন অর্জিত হয়।
তিনি বলেন, ১৯৪৭ সালের দেশভাগ থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ—ইতিহাসের প্রতিটি ঐতিহাসিক আন্দোলনের মূল লক্ষ্যই ছিল মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্য ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে।
স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও দেশের মানুষের প্রত্যাশিত পরিবর্তন পুরোপুরি অর্জিত হয়নি বলে আক্ষেপ প্রকাশ করেন এই প্রবীণ রাজনীতিক। তিনি বলেন, "আমাদের সঙ্গে একই সময়ে স্বাধীন হওয়া বিশ্বের অনেক দেশ আজ উন্নয়নের দৌড়ে বহু দূর এগিয়ে গেছে। দেশে জবাবদিহি, সুশাসন ও প্রকৃত গণতান্ত্রিক চর্চা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশও তাদের মতো আরও এগিয়ে যেতে পারবে।"
সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার তুমুল আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে বিএনপি মহাসচিব বলেন, আন্দোলনের শুরুতে তরুণদের ন্যায্য দাবির প্রতি দেশের আপামর জনসাধারণের ব্যাপক সমর্থন ছিল। পরবর্তীতে এই অধিকার আদায়ে সাধারণ শিক্ষার্থীসহ বহু মানুষ প্রাণ দিয়েছেন, যা দেশের মানুষের মধ্যে পরিবর্তনের গভীর আকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন।
তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, "শহীদদের পরিবারের এই ত্যাগ ও অবর্ণনীয় বেদনা জাতিকে সবসময় শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ রাখতে হবে। আমরা যদি তাদের এই আত্মত্যাগের প্রকৃত মূল্য ধারণ করতে না পারি, তবে সেই ত্যাগ একেবারেই অর্থহীন হয়ে যাবে।"
তিনি এমন একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলার তাগিদ দেন, যেখানে আর কোনো বাবা-মাকে তার সন্তানের অকাল মৃত্যুর শোক বইতে না হয়।
দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে মির্জা ফখরুল বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার একটি দূরদর্শী বার্তার কথা স্মরণ করিয়ে দেন।
তিনি বলেন, "বেগম জিয়া সবসময়ই প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসার রাজনীতির পরিবর্তে জাতীয় ঐক্য ও ভালোবাসার মাধ্যমে দেশ গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন। আগস্টের ঘটনাপ্রবাহের পর হাসপাতালে চরম অসুস্থ অবস্থায়ও তিনি দেশবাসীর উদ্দেশে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন ‘প্রতিশোধ নয়, সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে ভালোবাসার মাধ্যমে দেশ গড়ে তুলতে হবে।’"
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে খালেদা জিয়ার দীর্ঘ ত্যাগ ও জুলাইয়ের শহীদদের আত্মত্যাগ এই দুই প্রেরণা বুকে ধারণ করে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানান মির্জা ফখরুল।