
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন পরিবর্তনের দিন। টানা ৩৬ দিনের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে পতন ঘটে শেখ হাসিনার দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছরের শাসনামলের। পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে গেলে জরুরি ভিত্তিতে ভারতে আশ্রয়ের অনুরোধ জানান তিনি। সেখান থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার পর শেষ পর্যন্ত কীভাবে ঢাকা ছাড়েন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী, তা ছিল এক টানটান উত্তেজনাময় ঘটনাপঞ্জি।
আন্দোলনের শেষ ২৪ ঘণ্টা
ঘটনার সূত্রপাত ৪ আগস্ট থেকে। সেদিন দেশজুড়ে ছাত্র-জনতা ও সরকারি দলের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রায় একশত মানুষ প্রাণ হারান। ওইদিন বিকালেই দলের জ্যেষ্ঠ নেতা ও উপদেষ্টারা শেখ হাসিনাকে জানান যে পরিস্থিতি আর কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে নেই। দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছিল।
তবে শেখ হাসিনা কঠোর অবস্থানে অনড় ছিলেন। তাঁর ধারণা ছিল, বাহিনী দিয়ে শক্তি প্রয়োগ করেই আন্দোলন দমন করা সম্ভব। কিন্তু পরদিন সকালেই সেই হিসাব বদলে যায়।
গণভবনের শেষ বৈঠক ও পদত্যাগের সিদ্ধান্ত
৫ আগস্ট সকালে গণভবনে তিন বাহিনীর প্রধান ও পুলিশ প্রধানের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসেন শেখ হাসিনা। সেখানে আন্দোলনের তীব্রতা থামাতে না পারায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। একপর্যায়ে আইজিপির দিকে নির্দেশ করে কঠোর হওয়ার কথা বললে, তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে পুলিশের পক্ষেও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া আর সম্ভব নয়।
এর পরপরই শীর্ষ সামরিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানার সঙ্গে আলাদা কক্ষে আলোচনা করেন। সার্বিক পরিস্থিতি বুঝিয়ে তাঁকে অনুরোধ জানান শেখ হাসিনাকে সিদ্ধান্ত নিতে রাজি করানোর জন্য। শেখ রেহানা চেষ্টা করলেও শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছাড়তে নারাজ ছিলেন। অবশেষে বিদেশে থাকা ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলার পর পরিস্থিতি অনুধাবন করেন এবং পদত্যাগে সম্মতি জানান।
ঢাকা ছাড়ার সেই নাটকীয় মুহূর্ত
এদিকে ৫ আগস্ট সকাল থেকেই কারফিউ তোয়াক্কা না করে ঢাকার রাজপথে নামতে শুরু করে লাখো মানুষ।
অবস্থা বেগতিক দেখে তড়িঘড়ি করে ছোট বোন শেখ রেহানাকে সঙ্গে নিয়ে বেলা আড়াইটার দিকে একটি সামরিক হেলিকপ্টারে চড়ে গণভবন ত্যাগ করেন শেখ হাসিনা।
ভারতের পার্লামেন্টে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য
শেখ হাসিনার এই আকস্মিক আগমন নিয়ে পরবর্তীতে ভারতের লোকসভায় বিবরণ দেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। তিনি জানান, ৫ আগস্ট কারফিউ থাকা সত্ত্বেও আন্দোলনকারীরা ঢাকা দখল করে নিলে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হয়।
এভাবেই প্রবল গণরোশের মুখে ক্ষমতা হারিয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন শেখ হাসিনা, যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে সূচনা করে এক নতুন অধ্যায়ের।