

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এমনভাবে প্রবেশ করেছে যে কয়েক বছর আগেও যা ছিল কল্পনার বিষয়, আজ তা প্রায় স্বাভাবিক অভ্যাস। চিঠি লেখা, দীর্ঘ প্রতিবেদন সংক্ষেপ করা, ছবি তৈরি কিংবা কোডিং করা, সবকিছুতেই এখন এআই মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সাহায্য করছে। কিন্তু এই প্রযুক্তির সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে, আমরা যদি চিন্তা, স্মরণ, বিশ্লেষণ ও সমস্যা সমাধানের কাজ ক্রমাগত এআইয়ের হাতে ছেড়ে দিই, তবে আমাদের নিজস্ব মস্তিষ্কের ক্ষমতার কী হবে?
মনোবিজ্ঞানে কগনিটিভ অফলোডিং বা নিজের মস্তিষ্কে সম্পন্ন করার পরিবর্তে কোনো মানসিক কাজের অংশ যন্ত্রের ওপর ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতা নতুন নয়। মানুষ অতীতে ক্যালকুলেটর, জিপিএস বা ক্যালেন্ডার ব্যবহার করে আসছে। তবে জেনারেটিভ এআইয়ের ক্ষেত্রে পার্থক্যটি মৌলিক। ক্যালকুলেটর বা জিপিএস নির্দিষ্ট কাজ করলেও আধুনিক এআই তথ্য খোঁজা থেকে শুরু করে যুক্তি সাজানো, সারাংশ তৈরি এবং সম্পূর্ণ লেখা তৈরির মতো উচ্চতর জ্ঞানীয় কাজে অংশ নিচ্ছে। ফলে মানুষের চিন্তার কতটুকু অংশ যন্ত্রের হাতে চলে যাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয় ও মাইক্রোসফট রিসার্চের ২০২৫ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, এআইয়ের ওপর আস্থা যত বেশি, অনেক ক্ষেত্রে নিজের সমালোচনামূলক চিন্তার প্রয়াস তত কম হওয়ার সম্পর্ক রয়েছে।
প্রযুক্তির বুদ্ধিমত্তায় কোনো বিপদ নেই; বিপদ হলো নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে প্রযুক্তির হাতে তুলে দেওয়া।
শিক্ষাক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার নিয়ে বিশেষজ্ঞরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। গণিত বা বিজ্ঞান শেখার সময় ভুল করা এবং তা নিজে সংশোধন করার প্রক্রিয়াটি মস্তিষ্কের দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতি ও নিউরোপ্লাসিটি শক্তিশালী করতে সাহায্য করে। বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সহ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. রাশিদুল হক বলেন, সব বাধা দূর করে দিলে কাজ সহজ হয়, কিন্তু সব সময় শেখা গভীর হয় না। এআই যদি শিক্ষার্থীর সামনে থেকে প্রতিটি জ্ঞানীয় বাধা সরিয়ে দেয়, তবে সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় মানসিক দক্ষতার অনুশীলন কমে যেতে পারে।
এআই ব্যবহারের ফলে মানুষের ডিমেনশিয়া বা স্থায়ী স্মৃতিহানির দীর্ঘমেয়াদি কারণ-ফল সম্পর্ক এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে গবেষকদের মতে, নিয়মিত অনুশীলন না করলে ‘দক্ষতার ক্ষয়’ হতে পারে। অর্থাৎ, কোনো জ্ঞানীয় কাজ দীর্ঘদিন কম করলে সেই নির্দিষ্ট দক্ষতার কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে। জিপিএস ব্যবহারের ফলে যেমন মানুষের স্থানিক দিকনির্ণয়ের অনুশীলন কমে যায়, তেমনই সব লেখা এআই দিয়ে করালে নিজের ভাষায় চিন্তা প্রকাশের অনুশীলন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই সমাধান এআই বর্জন নয়, বরং এর সক্রিয় ও সচেতন ব্যবহার নিশ্চিত করা।
ভবিষ্যতের সবচেয়ে শক্তিশালী সমন্বয় হলো মানুষের অনুসন্ধিৎসু মস্তিষ্ক ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহযোগিতা। শিক্ষার্থী বা পেশাজীবীরা প্রথমে নিজে চিন্তা করে, পরে এআইয়ের সাহায্য নিয়ে নিজের যুক্তির দুর্বলতা যাচাই করতে পারেন। কোনো প্রশ্ন করা প্রয়োজন, কোন উত্তরটি বিশ্বাসযোগ্য এবং অর্জিত জ্ঞান কীভাবে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করা হবে, সেই চূড়ান্ত দায়িত্ব মানুষেরই হাতে থাকা উচিত।