

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গত রাতে সাংবাদিক ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালিয়েছে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা। এই সহিংস ঘটনায় চারজন সাংবাদিকসহ অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওতে এই হামলার দৃশ্য স্পষ্টভাবে দেখা গেছে, যা ক্যাম্পাসে নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর ক্যাম্পাসে এ ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতা ও গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর ধারাবাহিক আক্রমণ গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
ঘটনার পর তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রশাসনের ব্যর্থতার কথা স্বীকার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর জানান যে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি এবং পুলিশকে ফোন করা হলেও তারা আসতে পারেনি। অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) নিশ্চিত করেছেন যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট মামলা দায়ের করা হবে।
আমরা ব্যর্থ। আমাদের দ্বারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। আমরা পুলিশকে ফোন দিয়েছি। কিন্তু পুলিশও ভয়ে পালিয়ে গেছে। - রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদ তাৎক্ষণিকভাবে দুই সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিटीকে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে লিখিত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে অতীতে বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ঘটা সহিংসতার পর গঠিত তদন্ত কমিটিগুলোর কোনো দৃশ্যমান ফলাফল না পাওয়ার কারণে এই কমিটিগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে সচেতন মহলে সংশয় রয়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালানো নিছক রাজনৈতিক কোন্দল নয়, এটি একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। দীর্ঘকাল ধরে এ ধরনের অপরাধকে কেবল প্রশাসনিক শাস্তি বা সাময়িক বহিষ্কারের মাধ্যমে ধামাচাপা দেওয়ার সংস্কৃতি চলে আসছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিষ্ক্রিয়তা এবং রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া থাকার কারণে অপরাধীরা প্রায়শই আইনানুগ শাস্তির আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় সহিংসতার পথ প্রশস্ত করতে পারে।
জুলাই অভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষাই ছিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সব ধরনের সন্ত্রাস ও নিপীড়নমুক্ত রাখা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং সর্বশেষ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সহিংস ভূমিকা সেই পুরোনো সংস্কৃতিরই পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে। পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর বারবার এ ধরনের হামলা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর মারাত্মক হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
আরও পড়ুন: মতিঝিল ইবনে সিনা হাসপাতালে কিশোরীর মৃত্যু ও ভাঙচুরের ঘটনা
এই সহিংসতার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে হলে কেবল অভ্যন্তরীণ তদন্ত বা সাংগঠনিক শাস্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে কঠোর ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে ক্যাম্পাসের শিক্ষার পরিবেশ যেমন ধ্বংস হবে, তেমনি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিকাশও বাধাগ্রস্ত হবে।