

প্রযুক্তির দুনিয়ায় একক ব্যক্তির প্রভাবের কথা উঠলে সবার আগে যে নামটি সামনে আসে, তিনি হলেন অ্যাপলের সহপ্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবস। কোনো নতুন প্রযুক্তি সরাসরি আবিষ্কার না করলেও নকশা, ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা এবং সুনির্দিষ্ট ভাবনার মধ্য দিয়ে তিনি কম্পিউটার, ফোন ও বিনোদনের জগতের দূরত্ব কমিয়ে এনেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বেই অ্যাপল এমন সব পণ্য বাজারে নিয়ে এসেছিল, যা মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনের অভ্যাস চিরতরে বদলে দেয়। দত্তক সন্তান হিসেবে বেড়ে ওঠা, কলেজ ছেড়ে দেওয়া এবং নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে তাঁর এই বিশ্বজয়ী হয়ে ওঠার যাত্রার পেছনে রয়েছে বিচিত্র অভিজ্ঞতা।
১৯৫৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় জন্ম নেওয়া স্টিভের শৈশব কেটেছিল সিলিকন ভ্যালির কাছাকাছি এলাকায়। রিড কলেজে ভর্তি হলেও মাত্র ছয় মাস পর তিনি প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা ছেড়ে দেন। তবে নিজের আগ্রহের জায়গা থেকে তিনি ক্যালিগ্রাফির মতো বিষয়ে অংশ নেন, যা পরবর্তী সময়ে ম্যাকিনটোশ কম্পিউটার তৈরির সময় চমৎকার টাইপোগ্রাফি যুক্ত করতে বড় ভূমিকা রেখেছিল। ১৯৭৬ সালে স্টিভ ওজনিয়াকের সঙ্গে মিলে গ্যারেজে শুরু করেছিলেন অ্যাপলের পথচলা। আশির দশকে ম্যাকিনটোশ বাজারে আসার পর গ্রাফিক্যাল ইউজার ইন্টারফেসের মাধ্যমে ব্যক্তিগত কম্পিউটার ব্যবহারের ধারণাটি সম্পূর্ণ সহজ হয়ে যায়।
স্টিভ জবস ২০০৫ সালে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে বলেছিলেন, মানুষের জীবন সীমিত, তাই অন্যের জীবন অনুসরণ করে সময় নষ্ট না করে নিজের চিন্তা ও পথের ওপর আস্থা রাখতে হবে।
প্রাথমিক সাফল্যের পর পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে মতবিরোধের জেরে ১৯৮৫ সালে অ্যাপল ছাড়তে বাধ্য হন স্টিভ জবস। তবে থেমে থাকেননি তিনি। প্রতিষ্ঠা করেন নেক্সট নামের কম্পিউটার কোম্পানি এবং বড় বিনিয়োগ করেন অ্যানিমেশন স্টুডিও পিক্সারে, যার হাত ধরে মুক্তি পায় বিশ্বের প্রথম পূর্ণাঙ্গ কম্পিউটার-অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র টয় স্টোরি। ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝিতে অ্যাপল সংকটে পড়লে নেক্সটকে কিনে নেওয়ার মাধ্যমে ১৯৯৭ সালে আবার নিজের প্রতিষ্ঠানে ফিরে আসেন স্টিভ। এরপর আইম্যাক, আইপড, আইফোন এবং আইপ্যাডের মতো যুগান্তকারী পণ্যগুলো একে একে বাজারে এনে প্রযুক্তি বাজারে রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেন তিনি।
ব্যক্তিগত জীবনে স্বাস্থ্যগত জটিলতায় ভুগে ২০১১ সালের ৫ আগস্ট প্রধান নির্বাহীর পদ ছাড়েন এবং একই বছরের ৫ অক্টোবর ৫৬ বছর বয়সে মারা যান এই মহান উদ্যোক্তা। মৃত্যুর দেড় দশক পরও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো নকশা ও ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে তাঁর তৈরি করা মানদণ্ড অনুসরণ করছে। তাঁর কঠোর নেতৃত্ব, রূঢ় আচরণ ও জটিল ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সমালোচনা থাকলেও, প্রযুক্তি মানুষের জীবনে কেমন অনুভূতি তৈরি করবে সেই প্রশ্নটি সামনে এনে তিনি আধুনিক ডিজিটাল যুগের ভিত শক্ত করে গেছেন।