

কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার সোনাদিয়া দ্বীপে শ্বাসমূলীয় বা ম্যানগ্রোভ বন কেটে গড়ে তোলা অবৈধ চিংড়িঘের উচ্ছেদ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে পাঠানো এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব গত ৩ আগস্ট অনুমোদন করেছেন প্রধানমন্ত্রী। এর ফলে দীর্ঘদিনের দখলদারিত্বের কবলে পড়া দ্বীপটির প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনার পথ সুগম হলো।
২০০৬ সালে পরিবেশগত গুরুত্ব বিবেচনায় সোনাদিয়া দ্বীপকে প্রতিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা বা ইসিএ ঘোষণা করে সরকার। পরবর্তীতে ২০১৭ সালে ইকোট্যুরিজম পার্ক প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে দ্বীপটির ৯ হাজার ৪৬৬ দশমিক ৯৩ একর বনভূমি বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের বা বেজার কাছে বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর ফলে বন বিভাগ এই প্যারাবন রক্ষার আইনি কর্তৃত্ব হারায়। বেজার অধীনে কোনো কার্যকর ইকোট্যুরিজম কার্যক্রম না হওয়ায় সুযোগ নেয় প্রভাবশালী দখলদাররা। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এই সুযোগে অন্তত ৭ হাজার একর প্যারাবন কেটে ফেলা হয়েছে। তবে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ২০২৫ সালের মার্চে এই বনভূমি পুনরায় বন বিভাগের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহমিদা খানম জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী নৌবাহিনীকে সম্পৃক্ত করে সোনাদিয়া দ্বীপে অবৈধ দখল উচ্ছেদে সম্মতি দিয়েছেন। নৌবাহিনীও সার্বিক সহায়তা দিতে প্রস্তুত রয়েছে এবং দ্বীপটির জীববৈচিত্র্য ফেরাতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো হবে।
বন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ম্যানগ্রোভ বনের মধ্য দিয়ে প্রাকৃতিকভাবে জোয়ার-ভাটার প্রবাহ সচল না থাকলে বনের বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস হয়ে যায়। দখলদাররা খালের মুখে বাঁধ দিয়ে চিংড়ি চাষ করায় পুরো বন মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে। বর্তমান প্রকল্পের আওতায় সশস্ত্র বাহিনীকে সম্পৃক্ত করায় উচ্ছেদ কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে বলে আশা করা হচ্ছে। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ও প্রকল্প পরিচালক ফাহমিদা হক খান জানান, চলতি মাসেই সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ, নৌবাহিনী ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের একটি উচ্চপর্যায়ের সভা অনুষ্ঠিত হবে। ওই সভায় উচ্ছেদ অভিযানের চূড়ান্ত কর্মপরিকল্পনা ও বাজেট নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
স্থানীয় প্রশাসন ও পরিবেশবাদীরা এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানালেও দীর্ঘমেয়াদী সুফল পেতে কঠোর তদারকির ওপর জোর দিয়েছেন। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের বাপা সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির বলেছেন, কেবল উচ্ছেদ অভিযান চালালেই চলবে না, বরং ভবিষ্যতে যেন কেউ আর নতুন করে দখল করতে না পারে, সেজন্য শক্তিশালী নজরদারি ও বন বিভাগের জনবল বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হবে। দ্বীপের ক্ষতিগ্রস্ত প্যারাবনে জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে হারানো সবুজ ও জীববৈচিত্র্য পুনঃপ্রতিষ্ঠাই এখন প্রশাসনের মূল চ্যালেঞ্জ।