

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের আগামী প্রজন্মের নেতৃত্বের পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের রূপান্তর ঘটতে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার মাঝে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রেখে এবং বিগত সরকারের একমুখী ভারতকেন্দ্রিক নীতি থেকে সরে এসে সমতাভিত্তিক ও স্বাধীন কূটনীতির পথে হাঁটছে দেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলো। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এশিয়া সেন্টারের অ্যাসোসিয়েট জিওফ্রে ম্যাকডোনাল্ডের বিশ্লেষণে এই তথ্য উঠে এসেছে।
গত দুই দশকে বাংলাদেশ কৌশলগত ভারসাম্য বা হেজিং নীতি অনুসরণ করলেও বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ভারতের দিকে ঝুঁকে পড়েছিল। ১৫ বছরের দীর্ঘ শাসনকাল, দুর্নীতি এবং নির্বাচনপ্রক্রিয়া নিয়ে তীব্র সমালোচনার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে। এরপর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নিয়ে পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন করে ভারসাম্য সাজানোর প্রাথমিক ইঙ্গিত দেয়।
দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এই দলগুলোর দৃষ্টিভীতিতে ভিন্নতা থাকলেও পররাষ্ট্রনীতির মূল জায়গায় রয়েছে অভিন্ন ঐকমত্য। এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এড়িয়ে বহুমুখী অংশীদারত্বই হবে নতুন প্রজন্মের মূল কৌশল।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রভাবশালী তিন দলের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে রয়েছে নানা সমীকরণ। বিএনপি ঐতিহাসিকভাবে চীন, মুসলিম বিশ্ব ও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ার মাধ্যমে ভারতের প্রভাবের ভারসাম্য তৈরি করতে চেয়েছে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী ইসলামি সংহতির পাশাপাশি বাস্তবভিত্তিক সম্পর্ক বজায় রাখার পক্ষে জোর দিচ্ছে এবং ভারতের বিষয়ে কিছুটা সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। তরুণদের নিয়ে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি সম্পূর্ণ স্বাধীন, স্বচ্ছ ও জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
বাংলাদেশের আগামী প্রজন্মের নেতারা কোনো একক বিদেশি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সমদূরত্ব বজায় রেখে জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় বদ্ধপরিকর।
আরও পড়ুন: দুর্নীতি ও আধিপত্যবাদ রুখতে ঢাকা-রংপুর লংমার্চ শুরু জামায়াতের
আগামী দিনে বাংলাদেশের এই নতুন পররাষ্ট্রনীতি টিকিয়ে রাখা নির্ভর করবে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর। তবে সব দলের যৌথ ঐকমত্য এবং জনগণের ভারতবিরোধী মনোভাবের কারণে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও বেশি ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বাধীন হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি।