

ইসরায়েলের নির্বাচন ঘনিয়ে আসার প্রেক্ষাপটে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে হামাসের হামলার আগাম সতর্কতা গোপন করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার প্রায় ১০ দিন আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ এবং মিসরের গোয়েন্দাপ্রধান আব্বাস কামেল নেতানিয়াহুকে সুনির্দিষ্ট সতর্কতা দিয়েছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক স্বার্থে নেতানিয়াহু সেই উচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তা সতর্কতার বিষয়টি সম্পূর্ণ গোপন রাখেন বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
নির্বাচনের ঠিক প্রাক্কালে নেতানিয়াহু আবুধাবিতে তাঁর ঘনিষ্ঠ মিত্র মোহাম্মদ বিন জায়েদের সঙ্গে একটি গোপন বৈঠকে মিলিত হন। ইসরায়েলি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বিমানবন্দরে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে নেতানিয়াহু আমিরাতের প্রেসিডেন্টকে সতর্কতার খবরটি অস্বীকার করার অনুরোধ জানান। তবে ফিলিস্তিনি অধিকার ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে নিজেদের নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে আমিরাত প্রেসিডেন্ট সেই অনুরোধ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। পরবর্তীতে নেতানিয়াহুর কার্যালয় এই বৈঠকের খবরকে অস্বীকার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া প্রোপাগাণ্ডা বলে দাবি করে।
গাজা, পশ্চিম তীর ও লেবাননে ইসরায়েলের চলমান নৃশংস সামরিক অভিযানের মধ্যেও আরব দেশগুলোর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে তেল আবিবের এই গোপন যোগাযোগ নতুন করে আঞ্চলিক অসন্তোষ তৈরি করেছে। আবুধাবির বর্ধিত ওই বৈঠকে যেসব দেশের সঙ্গে ইসরায়েলের কোনো আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই, তাদের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিল বলে জানা যায়। মূলত ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব বজায় রাখার নামে এই গোপন অক্ষ পরিচালিত হচ্ছে। ২০২৪ সালে আমিরাত ও ইসরায়েলের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ১১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৩.২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং মিসর ২০২৫ সালে ৩৫ বিলিয়ন ডলারের গ্যাস চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।
আরব সরকারগুলো ফিলিস্তিনিদের জন্য মানবিক সহায়তা পাঠানোর পাশাপাশি মুখে ইসরায়েলের সমালোচনা করলেও গোপনে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখছে। দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের অধ্যাপক মোহাম্মদ এলমাসরি এই দ্বিমুখী নীতিকে একটি চরম বিপজ্জনক খেলা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সাম্প্রতিক মতামত জরিপ অনুযায়ী, আরব বিশ্বের ৮৭ শতাংশ সাধারণ মানুষ ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার তীব্র বিরোধী। শাসকগোষ্ঠীর এই গোপন নীতির ফলে সরকার এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে বিশাল দূরত্ব তৈরি হয়েছে, যা মরক্কোর তানজিয়ারসহ বিভিন্ন স্থানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে রূপ নিচ্ছে।
মার্কিন প্রশাসনের মধ্যস্থতায় আব্রাহাম চুক্তির সম্প্রসারণ এবং সৌদি আরবকে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার চেষ্টা অব্যাহত থাকলেও স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি ছাড়া রিয়াদ তা প্রত্যাখ্যান করেছে। আরব বসন্তের দেড় দশক পরও অঞ্চলের শাসকগোষ্ঠী গণ-অভ্যুত্থানের তীব্র আতঙ্কে রয়েছে। মিসর, জর্ডান ও বাহরাইনের মতো দেশগুলোতে রাজনৈতিক দমনপীড়ন ও নজরদারি বাড়ানো হলেও সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের রাজনৈতিক বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।