

বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী অভিনেতা, নাট্যকার, নির্দেশক ও শিক্ষাবিদ ইনামুল হক-এর আজ পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর দুপুরে বেইলি রোডের বাসায় চেয়ারে বিশ্রাম নেওয়ার সময় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। পরবর্তীতে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। ৭৮ বছর বয়সে তাঁর এই প্রয়াণে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেমে এসেছিল গভীর শোকের ছায়া। দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় ধরে মঞ্চ ও টেলিভিশনের পাশাপাশি বুয়েটে শিক্ষকতা করে তিনি রেখে গেছেন অনন্য দৃষ্টান্ত।
১৯৪৩ সালের ২৯ মে ফেনী সদর উপজেলার মোটবী ইউনিয়নে জন্ম নেওয়া ইনামুল হকের শৈশব কেটেছে নানা স্থানে। ফেনী পাইলট হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক শেষ করে ঢাকা নটর ডেম কলেজে পড়ার সময় ফাদার গাঙ্গুলীর নির্দেশনায় 'ভাড়াটে চাই' নাটকের মাধ্যমে মঞ্চে তাঁর অভিনয় জীবন শুরু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষে যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। বিজ্ঞানচর্চার পাশাপাশি নাটক ও অভিনয়ের প্রতি তাঁর অনুরাগ কখনো মিম্বমান হয়নি। ১৯৬৮ সালে তিনি নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন হিসেবে যুক্ত হন এবং পরে ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন 'নাগরিক নাট্যাঙ্গন'।
নাট্যচর্চার পাশাপাশি টেলিভিশন নাটকেও তাঁর অবদান ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ। বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্য তিনি প্রায় ৬০টি নাটক লিখেছেন। তাঁর রচিত 'সেইসব দিনগুলি', 'নির্জন সৈকতে' ও 'কে বা আপন কে বা পর' দর্শকমহলে দারুণ প্রশংসিত হয়। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে নির্মিত 'সেইসব দিনগুলি' তাঁর নাট্যরচনার এক উজ্জ্বল মাইলফলক। মঞ্চ ও টেলিভিশনে সফল অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) দীর্ঘ ৪৩ বছর রসায়ন বিভাগে শিক্ষকতা করেন। ১৫ বছর বিভাগের চেয়ারম্যান এবং দুই বছর ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের ডিনের দায়িত্ব পালন করে ২০০৮ সালে অধ্যাপক হিসেবে অবসর নেন তিনি।
শিল্প-সংস্কৃতি ও নাট্যাঙ্গনে অনন্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ২০১২ সালে একুশে পদক এবং ২০১৭ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হন ইনামুল হক। তাঁর পরিবারেও ছিল সংস্কৃতির আবহ। স্ত্রী লাকী ইনাম এবং দুই মেয়ে হৃদি হক ও প্রৈতি হক প্রত্যেকেই নাট্যজগতের সঙ্গে জড়িত। দুই জামাতা লিটু আনাম ও সাজু খাদেমও অভিনয়ে পরিচিত মুখ। ব্যক্তিজীবনে বিজ্ঞান ও শিল্প সংস্কৃতির মধ্যে অপূর্ব এক সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন এই গুণী মানুষটি।
আজ তাঁর প্রয়াণের পাঁচ বছর পরও দেশের নাট্যাঙ্গনে তাঁর শূন্যতা তীব্রভাবে অনুভূত হয়। মঞ্চের আলো থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর দায়িত্বশীল উপস্থিতি আজও নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে আছে। বহুমুখী প্রতিভার এই ক্ষণজন্মা মানুষটির স্মৃতি আজও তাঁর সহকর্মী, শিক্ষার্থী ও ভক্তদের হৃদয়ে অম্লান।