

অপ্রতিরোধ্য সামরিক শক্তি ও বিশাল বাজেট থাকা সত্ত্বেও সৌদি আরব কেন হুতি বিদ্রোহীদের চূড়ান্তভাবে পরাজিত করতে পারছে না, তার নেপথ্যে রয়েছে এক জটিল কৌশলগত সমীকরণ। ইন্দোনেশিয়া স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক অ্যাকশন ইনস্টিটিউশনের জ্যেষ্ঠ আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক রনি পি সাসমিতার মতে, রিয়াদের উন্নত যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র এবং আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা থাকলেও হুতিদের কৌশলগত অবস্থানের কারণে এই সংঘাত শুধু সামরিক উপায়ে সমাধান করা সম্ভব নয়। সৌদি আরব দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালাতে সক্ষম হলেও হুতিদের অরাষ্ট্রীয় ও অসমান যুদ্ধের কৌশলের কাছে তারা এক নতুন ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়েছে।
গত সপ্তাহে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দুবার ফোন করে হুতিদের ওপর সরাসরি হামলা চালাতে অনুরোধ করলেও ওয়াশিংটন তাতে সরাসরি রাজি হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র কেবল গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তা দিতে সম্মত হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে এটি স্পষ্ট হয়েছে যে, সৌদি আরবের প্রতিটি নিরাপত্তা সংকটের ঝুঁকি যুক্তরাষ্ট্র এখন আর আগের মতো নেবে না। একই সময়ে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের মোখা দখল এবং বাব আল-মানদেব প্রণালির কৌশলগত দ্বীপগুলোর দিকে হুতিদের অগ্রযাত্রা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে।
প্রতিপক্ষ যদি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থেকে বারবার শক্তি পুনর্গঠন করতে পারে এবং প্রথাগত যুদ্ধের কাঠামোর বাইরে তৎপরতা চালাতে পারে, তাহলে শুধু বিমানশক্তি দিয়ে রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান করা কঠিন।
সৌদি আরবের কৌশলকে বরাবরই 'শাস্তি দেওয়ার কৌশল' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যার লক্ষ্য হুতিদের সামরিক স্থাপনা ও অস্ত্র ধ্বংস করা। বিপরীতে হুতিদের লক্ষ্য হলো সৌদি আরবের অত্যন্ত মূল্যবান অথচ ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামোগুলোকে অনিরাপদ করে তোলা। ২০১৯ সালের আবকাইক ও খুরাইস তেল স্থাপনায় হামলার মতো ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, তুলনামূলক কম খরচের অসম হামলাও বিশ্বের অন্যতম সামরিক শক্তিধর দেশের অর্থনীতিতে বড় আঘাত হানতে পারে। হরমুজ প্রণালির বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের নিরাপত্তা এখন হুতিদের হুমকির মুখে পড়ায় সৌদি তেল রপ্তানি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
হুতিদের কাছে পরাজিত করার মতো কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ড বা অবকাঠামো নেই, বরং তারা কম খরচে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও সৌদি অর্থনীতিতে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। একটি সস্তা ড্রোন ভূপাতিত করতে ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের যে অর্থনৈতিক চাপ, তা সৌদি আরবকে দীর্ঘমেয়াদে সমস্যায় ফেলছে। বাব আল-মানদেবের মতো গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথগুলোর কাছাকাছি হুতিদের উপস্থিতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপরও এক স্থায়ী খড়্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের জন্য সংযম কিংবা সংঘাত বৃদ্ধি উভয় পথেই রয়েছে মারাত্মক ঝুঁকি। সামরিক শক্তি বা উন্নত প্রযুক্তি দিয়ে হুতিদের উৎক্ষেপণস্থল ধ্বংস করা গেলেও তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রণোদনা নির্মূল করা সম্ভব নয়। ফলে সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব সত্ত্বেও কৌশলগত সমীকরণ বদলাতে না পারলে সৌদি আরবের জন্য এই সংঘাতে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।