

বাংলাদেশে চলতি বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা তিনশ ছাড়িয়ে গেছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালের মেঝে ও সিঁড়িতে শুয়ে রোগীদের চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার প্রয়োজনে সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত রাখার ঘোষণা দিয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও নগর অধিকারকর্মী ওমর সাদাত এক বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছেন, এই পরিসংখ্যান ও ঘোষণা নিছক কোনো স্বাস্থ্যগত তথ্য নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার একটি স্পষ্ট দলিল।
বিগত সরকারগুলোর আমল থেকেই ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় প্রশাসনের ধারাবাহিক অসহায়ত্ব লক্ষ্য করা গেছে। রাজনৈতিক পালাবদল ঘটলেও সিটি করপোরেশনগুলোর কাজের ধরণে কোনো পরিবর্তন আসেনি। সংবিধানে নাগরিকদের জীবন ও জনস্বাস্থ্যের মান উন্নয়নের যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, প্রতিরোধযোগ্য রোগে এভাবে প্রাণহানি ঘটা সেই সাংবিধানিক দায়িত্বেরই লঙ্ঘন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যাটি কেবল মশার উপদ্রব নয়, বরং এর মূলে রয়েছে কার্যকর সুশাসন ও জবাবদিহির অভাব।
রাস্তার কাজে দুর্নীতি হলে রাস্তা ভাঙে, কিন্তু মশা মারার কাজে দুর্নীতি হলে মানুষ মারা যায়। জনস্বাস্থ্যে দুর্নীতি অন্য যেকোনো দুর্নীতির চেয়ে অনেক বেশি ভয়ংকর।
সিঙ্গাপুর বা ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশেও এডিস মশা রয়েছে, কিন্তু তারা বিজ্ঞানসম্মত নজরদারি ও উৎসে মশা নিধনের মাধ্যমে তা নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে। অথচ বাংলাদেশে প্রতিবছর মশা নিধনের নামে শত শত কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও তার স্বচ্ছ কোনো মূল্যায়ন পাওয়া যায় না। সরকারি জরিপে ঢাকার দুই সিটিতে বহু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করার পরও কার্যকর পদক্ষেপের অভাব রয়েছে। কীটনাশক কেনাকাটায় অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রায়ই গণমাধ্যমে উঠে আসে, যা কেবল প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়, বরং অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।
এই সংকট মোকাবেলায় ডেঙ্গুকে কেবল একটি মৌসুমি সমস্যা হিসেবে না ভেবে স্থায়ী জনস্বাস্থ্য অগ্রাধিকার হিসেবে আইনগত স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি। সংক্রামক রোগ আইন ও স্থানীয় সরকার আইনে পরিমাপযোগ্য কর্মদক্ষতার সূচক যুক্ত করা প্রয়োজন, যাতে ব্যর্থতা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। একই সঙ্গে কীটনাশক ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বাধীন পরীক্ষা ও প্রকাশ্য নিরীক্ষার ব্যবস্থা এবং সুশীল সমাজের উদ্যোগে জনস্বার্থে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের সময় এসেছে বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।