
প্রিন্ট এর তারিখঃ Oct 13, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Oct 13, 2026 ইং
মেহমানদারির সেরা আইটেম ডিমের কোরমা, নরম ডিমে ঘন ঝোলের স্বাদ

অতিথি এলে বা বাড়িতে বিশেষ কোনো দিনে মাংস ছাড়াও টেবিল সাজানো যায় চমৎকারভাবে। ডিমের কোরমা সেই রকম একটি পদ, যা দেখতে রাজকীয় আর খেতে দারুণ সুস্বাদু। নরম সেদ্ধ ডিম ঘন মশলাদার ঝোলে ডুবে থাকলে ভাত, পোলাও কিংবা খিচুড়ি, সব কিছুর সঙ্গেই জমে ওঠে।
বাঙালির অতিথি আপ্যায়নের ঐতিহ্য অনেক পুরনো। মেহমান এলেই টেবিলে একাধিক পদ সাজানোর রেওয়াজ আমাদের সংস্কৃতির অংশ। মাংস, মাছের পাশাপাশি ডিমের কোনো পদ থাকলে মেন্যুতে আসে বৈচিত্র্য। ডিমের কোরমা সেই জায়গাটা দারুণভাবে পূরণ করে। দেখতে যেমন আকর্ষণীয়, খেতেও তেমনি মুখরোচক। অনেক অতিথিই মাংসের কোরমার চেয়ে ডিমের কোরমা বেশি পছন্দ করেন, কারণ ডিম নরম হয় আর ঝোলটা হয় ঘন ও মশলাদার।
অনেকেই ডিমের কোরমা বানাতে গিয়ে ভয় পান ডিম ভেঙে যাওয়ার। আসলে ডিম ঠিকমতো সেদ্ধ করে হালকা ভেজে নিলেই এই সমস্যা হয় না। রেসিপিটি মেনে চললে প্রথম চেষ্টাতেই পাবেন পারফেক্ট ফল।
ডিমের কোরমায় দই ব্যবহারের সময় একটু সতর্ক থাকতে হয়। দই সরাসরি গরম মশলায় দিলে তা ফেটে যেতে পারে, তাই দই ভালোভাবে ফেটিয়ে অল্প অল্প করে দিয়ে ক্রমাগত নাড়তে হয়। এতে ঝোল হয় মসৃণ ও ঘন। চাইলে শেষ মুহূর্তে একটু ঘি ছড়িয়ে দিলে স্বাদ আরও বাড়ে।
## ডিম সেদ্ধর পারফেক্ট কায়দা
ডিমের কোরমার সাফল্যের অর্ধেক নির্ভর করে ডিম সেদ্ধর উপর। ডিম সেদ্ধ করতে পানিতে এক চিমটি লবণ দিন, এতে খোসা ছাড়াতে সুবিধা হয়। পানি ফুটে উঠলে ডিম ছেড়ে ৮ থেকে ১০ মিনিট সেদ্ধ করুন। এর বেশি সেদ্ধ করলে কুসুমের চারপাশে সবুজ দাগ পড়ে, দেখতে খারাপ লাগে। সেদ্ধ হয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে ঠান্ডা পানিতে ডুবিয়ে রাখুন, এতে খোসা সহজে ছাড়ে আর ডিমের গা মসৃণ থাকে। খোসা ছাড়ানোর সময় ডিমের গায়ে আঁচড় না লাগে সেদিকে খেয়াল রাখুন। তারপর ছুরি দিয়ে ডিমের গায়ে হালকা দুই তিনটি চির দিন, এতে ভাজার সময় মশলা ভেতরে ঢুকবে আর ডিম ফাটবে না।
## দই ফেটে যাওয়া রোধের উপায়
কোরমার ঝোল ঘন ও মসৃণ করার মূল উপাদান টক দই। কিন্তু দই নিয়ে কাজ করার সময় সতর্ক না থাকলে তা ফেটে ঝোল নষ্ট করে দিতে পারে। প্রথম নিয়ম, দই অবশ্যই ঘরের তাপমাত্রায় থাকতে হবে। ফ্রিজ থেকে বের করেই গরম মশলায় দেবেন না। দ্বিতীয়ত, দই ভালোভাবে ফেটিয়ে মসৃণ করে নিন, দলা থাকলে চলবে না। তৃতীয়ত, মশলা কষানোর পর আঁচ কমিয়ে দই দিন, আর দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটানা নাড়তে থাকুন। এই কায়দা মেনে চললে দই কখনো ফাটবে না, ঝোল হবে ক্রিমি ও ঘন।
## মশলার ভারসাম্য
কোরমার স্বাদের মূল রহস্য মশলার সঠিক ভারসাম্যে। পেঁয়াজ বাটা ভালোভাবে ভেজে বাদামি না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন, কাঁচা পেঁয়াজের গন্ধ থাকলে কোরমার স্বাদ নষ্ট হয়। আদা রসুন বাটা দেওয়ার পর আরও দুই মিনিট ভাজুন। গুঁড়া মশলা দেওয়ার সময় সামান্য পানি ছিটিয়ে দিন, এতে মশলা পুড়ে যায় না। হলুদ বেশি দিলে ঝোলের রং কালচে হয়ে যায়, পরিমাণমতো দিন। শেষে এক চিমটি চিনি দিলে সব মশলার স্বাদ একসঙ্গে বসে, ঝাল মিষ্টির ভারসাম্য তৈরি হয়।
## উপকরণ
ডিম ৬টি, পেঁয়াজ বাটা আধা কাপ, আদা বাটা ১ টেবিল চামচ, রসুন বাটা ১ চা চামচ, টক দই আধা কাপ, হলুদ গুঁড়া আধা চা চামচ, মরিচ গুঁড়া ১ চা চামচ, ধনে গুঁড়া ১ চা চামচ, জিরা গুঁড়া আধা চা চামচ, গরম মসলা গুঁড়া আধা চা চামচ, এলাচ ২টি, দারুচিনি ১ টুকরা, তেজপাতা ১টি, তেল আধা কাপ, লবণ ও চিনি স্বাদমতো।
## প্রণালী
১. ডিম সেদ্ধ করে খোসা ছাড়িয়ে নিন। খোসা ছাড়ানোর সময় ডিম ঠান্ডা পানিতে রাখলে কাজ সহজ হয়।
২. সেদ্ধ ডিমে ছুরি দিয়ে হালকা চিরে সামান্য লবণ ও হলুদ মাখিয়ে তেলে হালকা সোনালি করে ভেজে তুলে রাখুন।
৩. একই তেলে এলাচ, দারুচিনি ও তেজপাতা ফোড়ন দিয়ে পেঁয়াজ বাটা দিন। পেঁয়াজ বাদামি হওয়া পর্যন্ত ভাজুন।
৪. আদা ও রসুন বাটা দিয়ে আরও ২ মিনিট ভেজে হলুদ, মরিচ, ধনে ও জিরা গুঁড়া দিয়ে সামান্য পানি ছিটিয়ে কষান।
৫. টক দই ফেটিয়ে মশলায় দিয়ে নাড়তে থাকুন, যাতে দই ফেটে না যায়।
৬. মশলা থেকে তেল ছেড়ে এলে ১ কাপ গরম পানি দিয়ে ঝোল ফুটতে দিন।
৭. ভাজা ডিম ঝোলে ছেড়ে ঢেকে ৮-১০ মিনিট মাঝারি আঁচে রান্না করুন।
৮. গরম মসলা গুঁড়া ও এক চিমটি চিনি ছড়িয়ে নামিয়ে পরিবেশন করুন।
## সাধারণ ভুল ও সমাধান
ডিমের কোরমা বানাতে গিয়ে কয়েকটি ভুল প্রায়ই হয়। ডিম ভাজার সময় বেশি আঁচে ভাজলে ডিমের গা শক্ত হয়ে যায়, মাঝারি আঁচে হালকা সোনালি করাই যথেষ্ট। দই ফেটে গেলে ঝোল দেখতে খারাপ লাগে, উপরের কায়দা মেনে চলুন। ঝোল পাতলা হলে ঢাকনা খুলে কিছুক্ষণ জ্বাল দিন, পানি শুকিয়ে ঘন হয়ে আসবে। আবার ঝোল বেশি ঘন হয়ে গেলে একটু গরম পানি মিশিয়ে নিন। লবণ কম হলে ডিমের ভেতর স্বাদ ঢোকে না, তাই ঝোলে লবণ ঠিকমতো দিন। ডিম ঝোলে দেওয়ার পর বেশি নাড়াচাড়া করবেন না, নইলে ডিম ভেঙে যেতে পারে।
## পরিবেশন ও সংরক্ষণ
ডিমের কোরমা গরম ভাত, পোলাও, খিচুড়ি বা পরোটার সঙ্গে পরিবেশন করুন। উপরে একটু বেরেস্তা ছড়িয়ে দিলে দেখতে আরও আকর্ষণীয় লাগে। পাশে সালাদ বা লেবুর টুকরো রাখুন। মেহমানদারির টেবিলে এই পদ রাখলে সবাই প্রশংসা করবে।
কোরমা বানিয়ে ফ্রিজে এয়ারটাইট বাক্সে রেখে দুই দিন পর্যন্ত খাওয়া যায়। তবে ডিমের কোরমা টাটকাই সবচেয়ে ভালো লাগে। ফ্রিজ থেকে বের করে ভালোভাবে গরম করে নিন। গরম করার সময় একটু পানি ছিটিয়ে দিলে ঝোল শুকিয়ে যাবে না।
## একটু ভিন্ন স্বাদ চাইলে
মুরগির ডিমের বদলে হাঁসের ডিম দিলে কোরমা হয় আরও ঘন ও সুস্বাদু, তবে হাঁসের ডিমের গন্ধ অনেকের পছন্দ হয় না। চাইলে ডিমের সঙ্গে আলুও দিতে পারেন, আলু সেদ্ধ করে ভেজে ঝোলে ছেড়ে দিন। কেউ কেউ কোরমায় একটু নারকেল দুধ মেশান, এতে ঝোলে আসে মিষ্টি স্বাদের ছোঁয়া। যারা ঝাল কম খান, তারা মরিচের গুঁড়া কমিয়ে দিন।
ডিমের কোরমা একবার খেলে মাংসের কোরমার কথা ভুলে যাবেন অনেকেই। পোলাও বা সাদা ভাতের সঙ্গে এই পদ মেহমানদারিকে করে তুলবে স্মরণীয়।
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ ঢাকা স্টোরি ২০২৬