
প্রিন্ট এর তারিখঃ Oct 13, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Oct 13, 2026 ইং
শিশুকে মোবাইল থেকে দূরে রেখে অফলাইন খেলায় ফেরাবেন যেভাবে

খাবার টেবিলে, পড়ার ফাঁকে, এমনকি ঘুমানোর আগেও হাতে মোবাইল, আজকাল শিশুদের এটাই চেনা ছবি। অনেক বাবা-মা শান্তিতে কাজ সারতে বা বাচ্চাকে খাওয়াতে মোবাইল ধরিয়ে দেন। অল্প সময়ের জন্য সুবিধা হলেও ধীরে ধীরে এটা অভ্যাসে পরিণত হয়, আর শিশু সরে যেতে থাকে মাঠের খেলা, বই আর বন্ধুদের কাছ থেকে।
শিশুকে মোবাইল থেকে দূরে রাখার প্রথম শর্ত, বাবা-মায়ের নিজের অভ্যাস বদলানো। বাবা-মা সারাক্ষণ ফোনে ডুবে থাকলে শিশুকে ফোন ছাড়তে বলা কঠিন। তাই পরিবারে নির্দিষ্ট সময় ঠিক করুন, যখন সবাই ফোন দূরে রাখবে। যেমন খাবার সময় বা সন্ধ্যার এক ঘণ্টা। এই নিয়ম সবার জন্য সমান হলে শিশু সহজে মানিয়ে নেয়। বাবা-মা নিজে ফোন রেখে বই পড়লে বা গল্প করলে শিশুও সেটাই অনুকরণ করে। শিশুরা কথার চেয়ে কাজ দেখে বেশি শেখে।
বিকল্প না দিলে শুধু নিষেধ করে লাভ নেই। শিশুর হাতে তুলে দিন বই, ছবি আঁকার খাতা, পাজল বা বোর্ড গেম। বাড়ির পাশে মাঠ থাকলে বিকেলে বাইরে খেলতে পাঠান। কানামাছি, লুকোচুরি, দাড়িয়াবান্ধার মতো ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলো এখনো শিশুদের খুব আনন্দ দেয়। বন্ধুদের সঙ্গে মিশতে পারলে মোবাইলের কথা তারা নিজেই ভুলে যায়। বয়স অনুযায়ী খেলা বেছে নিন। ছোটদের জন্য রঙিন বই আর ব্লকস, একটু বড়দের জন্য দাবা, ক্যারাম বা সাইকেল চালানো ভালো বিকল্প।
একবারে পুরোপুরি বন্ধ না করে ধীরে ধীরে সময়সীমা ঠিক করে দিন। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ের বেশি মোবাইল ব্যবহার করা যাবে না, এই নিয়ম চালু করুন। প্রথমে হয়তো শিশু রাগ করবে, কান্নাকাটি করবে। এটা স্বাভাবিক, ধৈর্য ধরে থাকুন। কয়েকদিন পর নতুন রুটিনে অভ্যস্ত হয়ে যাবে। শিশু নিয়ম মানলে প্রশংসা করুন, উৎসাহ দিন। শাস্তির চেয়ে উৎসাহ অনেক বেশি কার্যকর। ভালো কাজের জন্য স্টিকার চার্ট বানাতে পারেন, নির্দিষ্ট স্টিকার জমলে ছোট্ট পুরস্কার দিন।
ঘুমের আগে মোবাইল সবচেয়ে ক্ষতিকর। ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে ফোন সরিয়ে রাখুন। এর বদলে গল্পের বই পড়ে শোনান বা দিনের মজার ঘটনা নিয়ে আলাপ করুন। শোবার ঘরে চার্জিং পয়েন্ট না রাখাই ভালো, যাতে রাতে ফোন হাতের কাছে না থাকে। সকালে ঘুম থেকে উঠেই ফোন না দিয়ে আগে নাশতা আর প্রস্তুতির কাজ শেষ করতে দিন। এই নিয়মগুলো পুরো পরিবারের জন্য প্রযোজ্য হলে শিশুর মানতে সুবিধা হয়।
ভ্রমণ বা অপেক্ষার সময়টা অনেক বাবা-মার জন্য কঠিন। গাড়িতে বা ডাক্তারের চেম্বারে বাচ্চাকে শান্ত রাখতে ফোনই সহজ সমাধান মনে হয়। এর বদলে সঙ্গে রাখুন ছোট খেলনা, রঙ পেনসিল বা গল্পের বই। বাইরের দৃশ্য দেখিয়ে গল্প বলুন, গাড়ি গোনা খেলুন। এই সময়গুলোতেও শিশু শেখে ধৈর্য আর পর্যবেক্ষণ। প্রথম কয়েকবার কঠিন লাগলেও পরে অভ্যাস হয়ে যায়।
সবচেয়ে জরুরি, শিশুর সঙ্গে সময় কাটান। অনেক শিশু একাকিত্ব থেকেই মোবাইলের দিকে ঝোঁকে। বাবা-মা যদি প্রতিদিন কিছুটা সময় শুধু তার জন্য রাখেন, গল্প করেন, খেলেন, তাহলে শিশুর মোবাইলের প্রতি টান এমনিতেই কমে। মনে রাখবেন, শিশুর সবচেয়ে প্রিয় সঙ্গ তার বাবা-মা। এই সময়টুকুই তাকে ফিরিয়ে আনবে বাস্তব খেলার জগতে। প্রতিদিন মাত্র আধা ঘণ্টা একান্ত সময়ও অনেক বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
দাদা-দাদি বা নানা-নানির সঙ্গও শিশুর জন্য দারুণ বিকল্প। তাদের কাছে শোনা রূপকথার গল্প আর পুরনো দিনের কথা মোবাইলের কোনো ভিডিও দিতে পারে না। সপ্তাহে একদিন পরিবারের সবাই মিলে বোর্ড গেম বা ক্যারাম খেলার আয়োজন করুন। বাইরে ঘুরতে নিয়ে যান, পার্কে হাঁটুন। শিশু যখন দেখবে বাস্তব জগতটাও মজার, তখন স্ক্রিনের আকর্ষণ এমনিতেই ফিকে হয়ে যাবে।
কয়েকটা সাধারণ ভুল এড়িয়ে চলুন। শিশুর সামনে নিজে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোন ব্যবহার করে তাকে নিষেধ করা সবচেয়ে বড় ভুল। দ্বিতীয় ভুল, হঠাৎ একদিনে পুরোপুরি ফোন কেড়ে নেওয়া। এতে শিশুর মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। তৃতীয় ভুল, ফোনের বদলে টিভি ধরিয়ে দেওয়া। স্ক্রিন তো স্ক্রিনই, মাধ্যম বদলালেই সমস্যা মেটে না। চতুর্থ ভুল, শিশুকে ব্যস্ত রাখতে না পেরে হাল ছেড়ে দেওয়া। ধারাবাহিকতাই সাফল্যের চাবি।
বই পড়ার অভ্যাস গড়তে পারলে মোবাইলের প্রয়োজন অনেকটাই কমে যায়। শিশুর বয়স আর পছন্দ অনুযায়ী মজার বই কিনে দিন। প্রথমে ছবিওয়ালা বই, তারপর ছোট গল্প, ধীরে ধীরে উপন্যাস। প্রতিদিন রাতে দশ মিনিট পড়ে শোনান, শিশু নিজেই একসময় পড়তে চাইবে। বাড়িতে ছোট্ট একটা বইয়ের তাক বানান, শিশুকে নিজের বই সাজাতে দিন। বই উপহার দেওয়ার অভ্যাস করুন, জন্মদিনে খেলনার পাশাপাশি বইও দিন।
স্কুলের পড়াশোনার জন্য অনেক সময় ফোন বা ট্যাব দরকার হয়। সেক্ষেত্রে পড়ার সময়টুকু আলাদা রাখুন, আর বিনোদনের সময় আলাদা। পড়া শেষ হলে ডিভাইস রেখে দিতে হবে, এই নিয়মটা পরিষ্কার রাখুন। সম্ভব হলে পড়ার জন্য আলাদা ডিভাইস ব্যবহার করুন, যাতে গেম আর ভিডিওর লোভ না থাকে। শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে জানুন স্কুলে কী নিয়ম, বাড়িতেও তার সঙ্গে মিল রাখুন।
ধৈর্য ধরুন, বদল আসতে সময় লাগে। মনে রাখবেন, শিশুর শৈশব একবারই আসে, এই সময়টাকে স্ক্রিনের বদলে ভালোবাসা আর খেলায় ভরিয়ে দিন। আজ যে শিশু মাঠে দৌড়ায়, বইয়ের পাতায় হারায়, বন্ধুর সঙ্গে হাসে, কাল সে-ই হবে আত্মবিশ্বাসী মানুষ। আপনার দেওয়া এই সময় আর মনোযোগই তার জীবনের সবচেয়ে দামি উপহার।
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ ঢাকা স্টোরি ২০২৬