

ঢাকা: পুরান ঢাকার চকবাজারের মনসুর খান প্লাজায় লাগা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে আবারও ভয়াবহ অগ্নিঝুঁকির চিত্র সামনে এসেছে। গত সোমবার (১২ অক্টোবর) বিকেলে ভবনটির ষষ্ঠ তলার একটি দোকান থেকে আগুনের সূত্রপাত হয় এবং ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিটের দীর্ঘ প্রচেষ্টায় মঙ্গলবার ভোর ৫টা ২০ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ভবনটি পরিদর্শন করে অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি পেয়েছিল ফায়ার সার্ভিস এবং ভবন মালিককে নোটিশ দেওয়া হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানানো হয়েছে।
ঘটনার দিন বিকেল ৫টা ২ মিনিটে আগুন লাগার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর চেষ্টা করলেও সরু গলি, তীব্র যানজট ও প্রবেশপথের সংকীর্ণতার কারণে মাত্র দুই কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে প্রায় কুড়ি মিনিট সময় লাগে। এছাড়া পর্যাপ্ত পানির অভাব, ভবনে ধোঁয়া বের হওয়ার পর্যাপ্ত পথ না থাকা এবং তালাবদ্ধ গুদামে বিপুল পরিমাণ মালামাল থাকায় উদ্ধারকর্মীদের মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়। ফায়ার সার্ভিস জানায়, ভবনটির চতুর্থ থেকে সপ্তম তলা পর্যন্ত বিভিন্ন পণ্যের গোডাউন ছিল যা মূলত একেকটি হিট চেম্বারের রূপ নিয়েছিল।
এ বিষয়ে ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তরের মিডিয়া সেলের প্রধান শাহজাহান শিকদার জানান, গত জানুয়ারি মাসে পরিদর্শনের পর অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি দেখতে পেয়ে ভবন মালিককে নোটিশ পাঠানো হলেও তার কোনো জবাব বা কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ঘটনাস্থলে অংশ নেওয়া ফায়ার ফাইটাররা জানান, ভবনের সিঁড়িতে মালামাল রাখা এবং গুদামগুলো তালাবদ্ধ থাকায় আগুন নেভানোর কাজ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও দীর্ঘায়িত হয়।
পুরান ঢাকার বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবনগুলোকে অপরিকল্পিতভাবে গুদামে রূপান্তর করার তীব্র সমালোচনা করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাবেক পরিচালক মেজর (অব.) এ কে এম শাকিল নেওয়াজ বলেন, আবাসিক ভবনকে বাণিজ্যিক গোডাউনে রূপান্তর এবং বৈদ্যুতিক অব্যবস্থাপনার কারণে এই এলাকায় ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। মনসুর খান প্লাজার এই অগ্নিকাণ্ড নিছক দুর্ঘটনা নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে, তা গভীরভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন।
ফায়ার সার্ভিসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজধানীতে দুই হাজারেরও বেশি ভবন বর্তমানে অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে পুরান ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বাণিজ্যিক ভবনে দাহ্য পদার্থ ও কেমিক্যালের মজুত পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে। বারবার বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার পরও কার্যকর নজরদারি ও নীতিমালা বাস্তবায়নের অভাবে এই জনপদের অগ্নিঝুঁকি এখনো কাটেনি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে ভবনগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা জোরদার করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও ভবন মালিকরা সচেতন না হলে এবং আইন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে আগামীতে এ ধরনের দুর্ঘটনা বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।