

ইরাকে মার্কিন আগ্রাসন-পরবর্তী প্রাণঘাতী সাম্প্রদায়িক সংঘাত এবং এক দশক আগের আইএসের উত্থানের ক্ষত মধ্যপ্রাচ্যে এখনও তাজা রয়েছে। এর মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য নীতি পুরো অঞ্চলকে নতুন এক ধ্বংসাত্মক ও বিপজ্জনক পরিণতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতা না বুঝেই ওয়াশিংটনের এমন পদক্ষেপে ইরাক, সিরিয়া ও লেবাননজুড়ে নতুন করে শিয়া-সুন্নি সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে মসুলের কাছে আইএসের গণকবর থেকে কুর্দি পেশমার্গা যোদ্ধা, ইরাকি নিরাপত্তাকর্মী ও ইয়াজিদি নারী-শিশুর ত্রিশটির বেশি দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সঙ্গে সিরিয়ার দেইরি আল-জোরে আরও একটি গণকবরের সন্ধান মিলেছে। সিরিয়া ও ইরাকের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির পাশাপাশি লেবাননের রাজনৈতিক সমীকরণ মধ্যপ্রাচ্যের সীমান্তব্যবস্থাকে নতুন করে সংকটে ফেলেছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কার কৃত্রিম সীমান্তব্যবস্থার এই সহিংস পরিণতি সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে।
ইরান ও শিয়া রাজনীতি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তাদের কোণঠাসা করে ট্রাম্প প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কৌশল নিয়েছে। সিরিয়ার নতুন সরকারকে হিজবুল্লাহ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দেওয়ার পাশাপাশি ইরাকের শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র সংবরণের চাপ দিচ্ছে ওয়াশিংটন। তবে শিয়া মিলিশিয়াগুলো অস্ত্র সমর্পণে সাফ অস্বীকৃতি জানিয়েছে। পিএমএফের মুখপাত্র মোহনাদ আল-ওকাবি সতর্ক করে বলেছেন যে, মিলিশিয়ারা সরে দাঁড়ালে ইরাকের নিরাপত্তাব্যবস্থা একমুহূর্তেই গুঁড়িয়ে যাবে।
বিশ্লেষকদের মতে, শতবর্ষী কৃত্রিম সীমান্ত ব্যবস্থার কারণে আজ প্রতিটি জনগোষ্ঠী নিজ নিজ জাতিগত ও ধর্মীয় সুরক্ষাবলয়ে ফিরে যাচ্ছে। ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের শত্রুতা ও শিয়া প্রতিরোধ আন্দোলনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন জোটে সমর্থন জোগানোর নীতি এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পর থেকেই মার্কিন নীতিনির্ধারকেরা সেখানকার স্থানীয় মনস্তত্ত্ব ও সাম্প্রদায়িক বিভাজন বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। ফলস্বরূপ, বর্তমান সময়েও তারা এমন কিছু মিত্র ও কৌশল বেছে নিচ্ছেন যা এই সংঘাতের আগুনকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ওয়াশিংটনের অস্ত্র সমর্পণের দাবি এবং শিয়া মিলিশিয়াদের অনড় অবস্থানের ফলে সৃষ্ট মনস্তাত্ত্বিক সংঘাত গোটা অঞ্চলকে এক ভয়ংকর গৃহযুদ্ধের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
লেবানন এবং উপসাগরীয় দেশগুলোতেও এই উত্তেজনার প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বাহরাইন ও কুয়েতে শিয়াদের ধর্মীয় কার্যক্রমে কড়াকড়ি এবং ইয়েমেনে নতুন করে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ায় সামগ্রিক পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছে। ওয়াশিংটনের উচিত অবিলম্বে নিজেদের হারিয়ে যাওয়া বিশেষজ্ঞ জ্ঞান পুনর্নির্মাণ করা এবং অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের প্রশাসনে ফিরিয়ে আনা, যাতে এই মহাবিপদ এড়ানো সম্ভব হয়।