

পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের বিরুদ্ধে পাকিস্তান আমলের পশ্চিমভিত্তিক শাসকশ্রেণির উপনিবেশবাদী দৃষ্টিভঙ্গি, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং প্রশাসনিক আধিপত্যের চিত্র ঐতিহাসিক বিভিন্ন দলিল ও গবেষণায় স্পষ্টভাবে উন্মোচিত হয়েছে। ভাষা, সংস্কৃতি এবং ইতিহাস নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকশ্রেণির বর্ণবাদী ও নেতিবাচক মনোভাবের কারণে দুই অঞ্চলের মধ্যে দূরত্ব ক্রমেই বৃদ্ধি পায়, যা পরবর্তীতে রাজনৈতিক সংঘাতে রূপ নেয়।
পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই পূর্ব বাংলার ভাষা ও সংস্কৃতিকে ভিন্ন চোখে দেখা হতো। বাংলা ভাষাকে অনৈসলামিক বা হিন্দুয়ানির ভাষা হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা শুধু সাধারণ মানুষের মধ্যে নয়, বরং উচ্চপর্যায়ের রাজনীতিবিদ ও আমলাদের মধ্যেও প্রবল ছিল। আইয়ুব খানের মতো শাসকরা তাদের আত্মজীবনীতে এবং বিভিন্ন নীতিমালায় পূর্ব বাংলার জনগণকে রাজনৈতিকভাবে অনুন্নত এবং মানসিকভাবে পরাধীন হিসেবে উপস্থাপনের অপচেষ্টা চালিয়েছেন।
পূর্ব বাংলার জনগণ সম্পর্কে আইয়ুব খানের বর্ণবাদী বয়ান এবং পশ্চিম পাকিস্তানের শ্রেষ্ঠত্ব প্রচারের নীতি পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে বৈষম্যের পথকে প্রশস্ত করেছিল।
রাজনীতির পাশাপাশি অর্থনীতি ও প্রশাসনের ক্ষেত্রেও চরম বৈষম্য বজায় রাখা হয়েছিল। অর্থনীতিবিদ ড. আখলাকুর রহমানের গবেষণা অনুযায়ী, পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে পুঁজি পাচার এবং বৈষম্যমূলক অর্থনৈতিক নীতির কারণে পূর্ব অঞ্চলের অনুন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়। ১৯৬৩ সালে খোদ প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান স্বীকার করতে বাধ্য হন যে, দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা সত্ত্বেও দুই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ব্যবধান সহসা দূর করা সম্ভব নয়।
রাষ্ট্রের দুই প্রধান স্তম্ভ জনপ্রশাসন ও সামরিক বাহিনীতেও বাঙালিদের অবদান ছিল উপেক্ষার পর্যায়ে। ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত কেন্দ্রীয় প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে পূর্ব পাকিস্তানিদের কোনো প্রতিনিধিত্ব ছিল না বললেই চলে। সেনাবাহিনীতে বাঙালি কর্মকর্তার হার ছিল মাত্র ৫ শতাংশ, যা ব্রিটিশ আমল থেকে চলে আসা তথাকথিত অযোদ্ধা জাতিতত্ত্বের বর্ণবাদী নীতিরই ধারাবাহিকতা।
ইতিহাসের এই কাঠামোগত বৈষম্য এবং উপনিবেশবাদী মানসিকতাই বাঙালি জাতিকে তাদের স্বাধিকার আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে বাধ্য করেছিল। বর্তমান স্বাধীন বাংলাদেশে সেই ঐতিহাসিক বৈষম্যগুলোর বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।