

সরকারি বা সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও ফাইল অনুমোদনের কারণে মামলা দায়ের বা আপিল করতে দেরি হলে, তা যথেষ্ট কারণ হিসেবে বিবেচনা করে মার্জনা করা যেতে পারে বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে বিচারপতি মো. রিয়াজ উদ্দিন খানের একক বেঞ্চের দেওয়া রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপিতে এই গুরুত্বপূর্ণ আইনি নির্দেশনা প্রকাশ করা হয়। বাংলাদেশ রেলওয়ের একটি দীর্ঘদিনের দেওয়ানি আপিল দায়েরে ১৬৮ দিনের বিলম্ব মার্জনা করে আদালত এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন।
মামলার পটভূমি থেকে জানা যায়, ২০০২ সালে শফিকুল ইসলাম লালমনিরহাটের জ্যেষ্ঠ সহকারী জজ আদালতে বাংলাদেশ রেলওয়ে ও অন্যদের বিরুদ্ধে একটি দেওয়ানি মামলা দায়ের করেন। ২০০৩ সালের ২৪ নভেম্বর আদালত তার পক্ষে রায় ও ডিক্রি ঘোষণা করেন। এই রায়ের বিরুদ্ধে ২০০৪ সালে জেলা জজ আদালতে দেওয়ানি আপিল করে বাংলাদেশ রেলওয়ে। তবে আপিল দায়ের করতে ১৬৮ দিন দেরি হওয়ায় তামাদি আইনের ৫ ধারায় বিলম্ব মার্জনার আবেদন করে সংস্থাটি। পর্যাপ্ত ব্যাখ্যার অভাবে ২০০৪ সালের ১ আগস্ট সেই আবেদন খারিজ করে দেন সংশ্লিষ্ট আদালত। পরবর্তীতে এই আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্ট বিভাগে দেওয়ানি রিভিশন আবেদন করে বাংলাদেশ রেলওয়ে।
রিভিশন আবেদনের শুনানিতে নিম্ন আদালতের নথি ও আইনি নীতিমালা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করেন হাইকোর্ট। আদালত পর্যবেক্ষণে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, বাংলাদেশ রেলওয়ের মতো একটি সরকারি সংবিধিবদ্ধ সংস্থাকে আইনি পরামর্শ গ্রহণ, ফাইল অনুমোদন এবং প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের মতো একাধিক জটিল প্রশাসনিক ধাপ অতিক্রম করতে হয়। আদালতের মতে, এ ধরনের কাঠামোগত আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কারণে সৃষ্ট বিলম্বকে কোনোভাবেই ইচ্ছাকৃত বলা চলে না।
আদালত তার রায়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পূর্বের বিভিন্ন নজির ও আইনি বিধান বিশ্লেষণ করেছেন। রায়ে বলা হয়েছে, সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণের দীর্ঘসূত্রতা ও দাপ্তরিক প্রক্রিয়া একটি বাস্তব সত্য। তাই শুধুমাত্র দাপ্তরিক ফাইল চালাচালির কারণে কোনো মামলার আইনি প্রতিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। এই যুক্তিতে হাইকোর্ট জেলা জজ আদালতের ২০০৪ সালের ১ আগস্টের আদেশটি সম্পূর্ণ বাতিল বলে ঘোষণা করেন এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের আপিল দায়েরে ১৬৮ দিনের বিলম্ব মঞ্জুর করেন।
বর্তমান আইনি পরিস্থিতিতে এই রায় সরকারি ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি নতুন দিক উন্মোচন করেছে। রায়ের পর সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে যথাযথ নোটিশ পাঠিয়ে ২০০৪ সালে দায়ের করা মূল দেওয়ানি আপিলটি আইন অনুযায়ী দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করার জন্য নিম্ন আপিল আদালতকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতার শিকার মামলার জট খুলতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন আইনি বিশেষজ্ঞরা।