

যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান সামরিক তৎপরতা এবং অর্থনৈতিক চাপের মুখে ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্র কিউবার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ইতিহাসের অন্যতম কঠিন সময়ের মুখোমুখি হয়েছে। বছরের শুরুতে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন অভিযানের পর থেকেই হাভানার ওপর ওয়াশিংটনের আক্রমণাত্মক মনোভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যা বিশ্বরাজনীতিতে দীর্ঘকাল ধরে টিকে থাকা কিউবার বিপ্লবের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর শঙ্কার জন্ম দিয়েছে।
১৯৫৯ সালে ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে সফল হওয়া এই বিপ্লব শুরু থেকেই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এক আপসহীন প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে ওঠে। ১৯৬০ সালে জাতিসংঘে যোগ দিতে নিউ ইয়র্কে গিয়ে হার্লেমের হোটেল থেরেসায় অবস্থান এবং কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার হওয়ার মাধ্যমে কিউবা বিশ্ববাসীর নজর কাড়ে। পরবর্তী সময়ে বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে চিকিৎসক পাঠানো এবং বর্ণবাদবিরোধী লড়াইয়ে অংশ নিয়ে কিউবা গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর আস্থার প্রতীক হয়ে ওঠে।
নেলসন ম্যান্ডেলা নিজেই বলেছেন, অ্যাঙ্গোলায় কিউবার সামরিক হস্তক্ষেপ শ্বেতাঙ্গ শোষকদের অজেয়তার অহংকার ভেঙে দিয়েছিল এবং দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসনের পতন ত্বরান্বিত করেছিল।
গত ষাট বছরেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধের মুখেও কিউবা শিক্ষা, সাক্ষরতা এবং চিকিৎসা খাতে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরও দেশটি নিজেদের অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয় এবং টেকসই কৃষি ব্যবস্থার ওপর জোর দেয়। তবে দীর্ঘমেয়াদী অবরোধ এবং দেশের মানুষের রাজনৈতিক স্বাধীনতা খর্ব করা ও মতপ্রকাশের অধিকার দমনের অভিযোগ কিউবান সরকারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কিউবা যেভাবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দশকের পর দশক ধরে শক্ত অবস্থান বজায় রেখেছে, তা বিশ্বমঞ্চে এক ধরনের ট্রিকস্টার বা ভেল্কিবাজ চরিত্রের প্রতিনিধিত্ব করে। মার্কিন প্রশাসনের নানা দমনপীড়ন ও অভ্যন্তরীণ ত্রুটি সত্ত্বেও কিউবার এই বিকল্প রাজনীতির মডেল বিশ্বমঞ্চে একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে।
বর্তমানে মার্কিন চাপে যদি কিউবার এই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের চূড়ান্ত পতন ঘটে, তবে তা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ক্ষমতার একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি করবে। বিকল্প কণ্ঠস্বর বা সাম্রাজ্যবাদকে চ্যালেঞ্জ করার মতো শক্তির অনুপস্থিতি বিশ্বকে আরও জটিল ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিতে পারে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।