জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের দিনই লন্ডন থেকে এলো স্বস্তির খবর। ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের শারীরিক অবস্থার বড় উন্নতি হয়েছে। নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) এর মহাসচিব লিটন এরশাদ বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) জানিয়েছেন, এখন আর কাঞ্চনকে কেমোথেরাপি নিতে হচ্ছে না। চিকিৎসকেরা তাকে অনেকটাই ঝুঁকিমুক্ত বলে জানিয়েছেন। লিটন এরশাদের ভাষায়, এই উন্নতি ‘অলৌকিক’।
বর্তমানে লন্ডনে মেয়ের বাসাতেই আছেন ইলিয়াস কাঞ্চন। চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে বাসা থেকেই মুখে খাওয়ার ওষুধের মাধ্যমে তার চিকিৎসা চলছে। লিটন এরশাদ বলেন, ‘তার চিন্তাভাবনা এখন অনেকটাই স্বাভাবিক। নিয়মিত আমাদের সঙ্গে কথা বলছেন। নিরাপদ সড়ক নিয়ে তার পরিকল্পনার কথাও জানাচ্ছেন। আমরা আশা করছি, তিনি শিগগিরই পুরোপুরি সুস্থ হয়ে আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন।’ বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি আরও বলেন, চিকিৎসা শেষ হলে কাঞ্চন দ্রুত দেশে ফিরতে পারবেন বলে চিকিৎসকেরা আশা করছেন।
গত বছরের এপ্রিল থেকে লন্ডনে চিকিৎসা নিচ্ছেন ইলিয়াস কাঞ্চন। ব্রেন টিউমার ধরা পড়ার পর ওই বছরের আগস্টে লন্ডনের একটি হাসপাতালে তার মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার করা হয়। চিকিৎসকেরা টিউমারের বড় একটি অংশ অপসারণ করতে পারলেও ঝুঁকির কারণে পুরোটা সরানো সম্ভব হয়নি। এরপর দীর্ঘদিন ধরে চলে তার কেমোথেরাপি ও ওষুধের চিকিৎসা। মাঝে গত আগস্টে কয়েকদিনের জন্য দেশে ফিরেছিলেন তিনি, তখনো তার শারীরিক অবস্থা তেমন ভালো ছিল না। কয়েকদিন পর আবার তাকে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে নিয়ে যাওয়া হয়।
এই সুখবরের ঠিক কয়েকদিন আগের চিত্র ছিল একেবারেই উল্টো। সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে হঠাৎ কাঞ্চনের মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়লে ভক্তদের মধ্যে উদ্বেগ আর ক্ষোভ তৈরি হয়। নিসচা সেই গুজবের তীব্র প্রতিবাদ জানায়, সংগঠনটির দেশজুড়ে প্রায় ১২০টি শাখা প্রতিবাদে সামিল হয়। লিটন এরশাদ তখন বলেছিলেন, মৃত্যু বা অসুস্থতার মতো সংবেদনশীল বিষয়ে যাচাই ছাড়া খবর ছড়ানো সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। সেই উদ্বেগের পর নিসচার পক্ষ থেকে জানানো আজকের এই খবর ভক্ত ও সহকর্মীদের জন্য বড় স্বস্তির। চলচ্চিত্র অঙ্গনের অনেকেই এতদিন তার সুস্থতা কামনা করে আসছিলেন, সম্প্রতি শাকিব খানও সামাজিক মাধ্যমে কাঞ্চনের জন্য সবার দোয়া চেয়েছেন।
শুধু স্বাস্থ্যের খবরই নয়, জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসে লন্ডন থেকে লিখিত বক্তব্যও দিয়েছেন ইলিয়াস কাঞ্চন। দেশবাসী, নিসচার নেতাকর্মী, শুভানুধ্যায়ী ও সড়ক ব্যবহারকারীদের দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদা, সচেতনতা ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে পালনের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তার ভাষ্যে, ‘২২ অক্টোবর শুধু একটি দিবস নয়। এই দিনটি আমাদের শোক, স্মৃতি, আন্দোলন এবং সড়কে মানুষের জীবন রক্ষার অঙ্গীকারের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।’ তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, বেশিরভাগ দুর্ঘটনার পেছনে থাকে অতিরিক্ত গতি, বেপরোয়া চালনা, চালকের ক্লান্তি বা অদক্ষতা, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, অনিরাপদ সড়ক আর দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা না পাওয়ার মতো চেনা ঝুঁকি। ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করলে এসব ঝুঁকি কমানো যায় বলে মত দিয়েছেন তিনি। তার কথায়, সড়ক দুর্ঘটনা অনিবার্য নয়, নিরাপদ ব্যবস্থা গড়ে তুললে বহু প্রাণ বাঁচানো সম্ভব।
সরকারের কাছে বিশেষ আবেদনে কাঞ্চন বলেছেন, সড়ক নিরাপত্তার উদ্যোগ যেন শুধু দিবস পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে। ২২ অক্টোবর থেকে পরের বছরের ২২ অক্টোবর পর্যন্ত সড়ক নিরাপত্তার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ, সময়বদ্ধ ও পরিমাপযোগ্য এক বছরের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। কোন মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা সংস্থা কোন কাজ করবে, কখন করবে এবং অগ্রগতি কীভাবে যাচাই করা হবে, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করার কথা বলেছেন তিনি। পরের জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসে ওই এক বছরের কাজের প্রকাশ্য মূল্যায়নও চেয়েছেন কাঞ্চন, যাতে কী লক্ষ্য নেওয়া হয়েছিল, কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে আর কোথায় ঘাটতি রয়ে গেছে, তা দেশবাসী জানতে পারে।
১৯৯৩ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চনকে হারানোর পর থেকেই নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন ইলিয়াস কাঞ্চন। তার প্রতিষ্ঠিত নিসচা ১৯৯৪ সাল থেকে ২২ অক্টোবরকে নিরাপদ সড়ক দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। সংগঠনটির জোরালো দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৭ সালে সরকার এই দিনটিকে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস ঘোষণা করে। তিন দশকের বেশি সময় ধরে চলা এই আন্দোলনের প্রাণপুরুষের সুস্থ হয়ে ওঠার খবরে তাই এবারের দিবসটিতে ভক্ত আর শুভানুধ্যায়ীদের মধ্যে যোগ হয়েছে বাড়তি আবেগ।