

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে সাধারণ নাগরিকদের স্বস্তি দিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ জ্বালানি আমদানিতে শুল্ক-কর কমালেও, বাংলাদেশ সরকার এই নীতি থেকে সরে এসেছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসান কমানোর যুক্তি দেখিয়ে এবং প্রতিবেশী দেশে তেল পাচারের আশঙ্কায় গত রোববার রাতে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি একলাফে ২০ টাকা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে সরকার। এর পাশাপাশি নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের বিশাল আর্থিক চাপ সামলাতে কর ছাড়ের দাবিও নাকচ করে দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে ইনভয়েস ভ্যালু বা চালান-মূল্যের ওপর শুল্ক আরোপের নিয়ম চালু করা হয়, যা বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও বহাল রেখেছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে দেশের বাজারে খুচরা মূল্য এবং সরকারের সংগৃহীত রাজস্ব উভয়েই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সিঙ্গাপুর স্পট মার্কেটের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি লিটার জ্বালানি আমদানিতে প্রায় ৩২ শতাংশ শুল্ক ও কর যুক্ত হচ্ছে, যার বড় অংশই সরকারের কোষাগারে রাজস্ব হিসেবে জমা হচ্ছে। অথচ বৈশ্বিক সংকটে ভারত, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো কর হ্রাস বা লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি দিয়ে নাগরিকদের সুরক্ষা দিলেও বাংলাদেশ ব্যতিক্রমী অবস্থান নিয়েছে।
জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধির কারণে ইনফ্লেশনারি প্রেসার বা মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ন্ত্রণে ফিসক্যাল ও মনিটারি পলিসিতে যে ধরণের পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, তা দেখা যাচ্ছে না। অতিরিক্ত মূল্যস্ফীতি থেকে মানুষকে রক্ষায় সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাড়াতেও সরকারের আর্থিক সক্ষমতা সীমিত। - ড. জাহিদ হোসেন, বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ
সরকারের এমন সিদ্ধান্তকে জনস্বার্থবিরোধী বলে আখ্যায়িত করেছেন অর্থনীতিবিদ ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) প্রতিনিধিরা। ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, সরকার একদিকে ভ্যাট ও ট্যাক্সের নামে বিপুল অর্থ নিচ্ছে, অন্যদিকে মুনাফাও করছে। অথচ রাষ্ট্রীয় এই সংস্থার এই সময়ে মুনাফা করার কথা ছিল না। এদিকে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জ্বালানি খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আহরণ প্রায় ২৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
আগামী ১৭ মাসে প্রায় ২৪ লাখ সরকারি চাকরিজীবী ও পেনশনারদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে অতিরিক্ত ১.০৫ লাখ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই বিশাল ব্যয় মেটাতে গিয়েই সরকার জ্বালানি খাত থেকে বাড়তি রাজস্ব তোলার কৌশল নিয়েছে, যার ফলে বিপিসির লাভ হলেও সাধারণ ভোক্তারা মারাত্মক আর্থিক সংকটের মুখে পড়ছেন। তেলের দাম বৃদ্ধির জেরে ইতিমধ্যে বাস ও পণ্যবাহী ট্রাকের ভাড়া বাড়ার পাশাপাশি কৃষিপণ্যের উৎপাদন ব্যয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।