

তীব্র রেডিওথেরাপি মেশিন সংকটের কারণে জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালসহ দেশের প্রধান সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসার জন্য মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হচ্ছে হাজারো ক্যান্সার রোগীকে। কম খরচে উন্নত চিকিৎসার আশায় আসা সাধারণ রোগীরা প্রতিদিন সকাল থেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইন ধরেও থেরাপির নির্দিষ্ট তারিখ বা স্লট পাচ্ছেন না, ফলে জটিল হয়ে উঠছে তাদের শারীরিক অবস্থা।
গত বছরের ডিসেম্বরে হাড়ের ক্যান্সার শনাক্ত হওয়ার পর ফরিদপুরের আলফাডাঙার ছয় বছরের শিশু আবু সুফিয়ান সাতটি কেমোথেরাপি ও সার্জারির ধকল সামলে এখন রেডিওথেরাপির অপেক্ষায় রয়েছে। তার মতো সাড়ে ছয় থেকে সাত হাজার রোগী বর্তমানে জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউটে অপেক্ষায় রয়েছেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতি চলতে থাকলে অনেক রোগীর ক্ষেত্রে থেরাপি পেতে এক থেকে দেড় বছর পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে।
যদি সাত থেকে দশটি মেশিন চালু থাকত, তাহলে এখন যে রোগীদের এক থেকে দেড় বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে, সেটা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা যেত। প্রতিদিন ২০০-র বেশি নতুন রোগী আসে, কিন্তু যাদের আগে থেকে তারিখ দেওয়া আছে, তাদেরই আগে চিকিৎসা দিতে হয়। - মোস্তফা আজিজ সুমন, পরিচালক, জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউটে তিনটি বাঙ্কার খালি থাকলেও বর্তমানে কার্যকর রয়েছে মাত্র দুটি লিনাক মেশিন। সকাল আটটা থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত চালিয়েও দুটি মেশিনে সর্বোচ্চ আড়াইশ রোগীর চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। একইভাবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়েও (বিএমইউ) একই ধরনের সংকট চলছে। বিএমইউতে একটিমাত্র মেশিনে দৈনিক মাত্র ৭০ জন রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হওয়ায় ছয় মাসের অপেক্ষমান তালিকায় থাকতে হচ্ছে রোগীদের। চিকিৎসকদের মতে, এত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করলে ক্যান্সারের মাত্রা আরও মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে।
বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটির হিসাব অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ১৩ থেকে ১৫ লাখ মানুষ ক্যান্সার নিয়ে বেঁচে আছেন এবং প্রতি বছর নতুন করে প্রায় দুই লাখ মানুষের শরীরে এই রোগ শনাক্ত হয়। সরকারি হাসপাতালে একটি সম্পূর্ণ কোর্সে খরচ হয় ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা, যেখানে বেসরকারি হাসপাতালে এই খরচ প্রায় দুই লাখ টাকা। অর্থনৈতিক কারণে সাধারণ রোগীরা সরকারি হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল হলেও চাহিদার তুলনায় মেশিন মাত্র কয়েকটি থাকায় দেখা দিয়েছে চরম অচলাবস্থা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (প্রশাসন) জাহিদ রায়হান জানিয়েছেন, ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের জন্য একটি নতুন লিনিয়ার অ্যাক্সিলারেটর কেনা সম্পন্ন হয়েছে এবং আগামী জানুয়ারির মধ্যে সেটি চালু হবে। এছাড়া কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের জন্য আরও একটি মেশিন কেনার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। অতীতে সরকারি কেনাকাটায় অনিয়ম ও উদাসীনতার কারণে অনেক মেশিন নষ্ট হওয়ার কথা স্বীকার করে বর্তমান কর্তৃপক্ষ এই সংকট নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।