
ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ এবং ইরানের পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্র এখন বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এক অশনিসংকেত হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি ধমনী ‘হরমুজ প্রণালি’ অচল হয়ে পড়ায় বাংলাদেশ এক বহুমুখী অর্থনৈতিক সংকটের (Perfect Economic Storm) মুখে পড়তে যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, কৃষি, শিল্প এবং বৈদেশিক বাণিজ্য সবই মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর এই যুদ্ধের সম্ভাব্য ৫টি বড় প্রভাব নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:
বাংলাদেশের এলএনজি (LNG) আমদানির প্রধান উৎস কাতার ও ওমান। এই দুই দেশের জাহাজ চলাচলের একমাত্র পথ হরমুজ প্রণালি। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এলএনজি কার্গো আসতে বিলম্ব হলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র ও শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ তলানিতে নামবে। এতে দেশজুড়ে লোডশেডিং এবং কলকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সৌদি আরব ও আরব আমিরাত থেকে আসা অপরিশোধিত তেলও একই রুট ব্যবহার করে। সৌদি আরবের রাস তানুরা তেল টার্মিনালে ড্রোন হামলার পর সরবরাহ ব্যবস্থা আরও নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। বিপিসির (BPC) তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে ১৪ দিনের ডিজেল ও ১৫ দিনের পেট্রোলের মজুত রয়েছে। স্বল্প মেয়াদে এটি সামাল দেওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে সরকারের ওপর বিশাল ভর্তুকির চাপ পড়বে।
বর্তমানে দেশে বোরো মৌসুম চলছে, যেখানে সেচের জন্য নিরবচ্ছিন্ন ডিজেল ও বিদ্যুতের প্রয়োজন। জ্বালানি সংকট দেখা দিলে সেচ পাম্পগুলো বন্ধ হয়ে যাবে, যার প্রভাব সরাসরি পড়বে ধান উৎপাদনে। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরিয়া সারের বড় অংশ এই রুট দিয়ে আসায় সারের দাম ও সরবরাহ নিয়ে নতুন অস্থিরতা তৈরি হতে পারে, যা খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলবে।
সমুদ্রপথ ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় অনেক শিপিং কোম্পানি আফ্রিকার ‘কেপ অব গুড হোপ’ হয়ে বিকল্প পথে চলছে। এতে পরিবহন সময় ১০-১৫ দিন বেড়ে যাচ্ছে এবং ‘ওয়ার রিস্ক সারচার্জ’ যুক্ত হওয়ায় কন্টেইনার প্রতি কয়েক হাজার ডলার অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। এর ফলে ভোজ্যতেলসহ আমদানি করা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে।
শিপিং খরচ বেড়ে যাওয়ায় রপ্তানিনির্ভর পোশাক খাত চাপের মুখে পড়বে। বিদেশি ক্রেতারা বাড়তি খরচ দিতে রাজি না হলে পোশাক কারখানার মুনাফা কমবে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।