দেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর কাজ সময়মতো শেষ না করে বার বার মেয়াদ বৃদ্ধি এবং এর অজুহাতে প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে দেওয়ার নেতিবাচক প্রবণতার ওপর চরম বিরক্তি ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী এবং একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমান। উন্নয়ন প্রকল্পে এই ধরনের ধীরগতি ও অর্থ অপচয়ের পেছনে কার গাফিলতি বা কী স্বার্থ রয়েছে, তা গভীরভাবে তদন্ত করে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে খুঁজে বের করতে এবং তাকে কঠোর শাস্তির আওতায় আনার জন্য স্পষ্ট তাগিদ দিয়েছেন সরকারপ্রধান।
মঙ্গলবার (৯ জুন) বাংলাদেশ সচিবালয়ের বিশেষ কক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে পরিকল্পনাসূত্রে এই চাঞ্চল্যকর নির্দেশনার কথা জানা গেছে।
এদিনের একনেক সভায় মোট ৩ হাজার ৮৯০ কোটি ৯৭ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয় সম্বলিত ১০টি গুরুত্বপূর্ণ মেগা ও মাঝারি প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে। অনুমোদিত ব্যয়ের মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল (জিওবি) থেকে জোগান দেওয়া হবে ৩ হাজার ৮১০ কোটি ৬২ লাখ টাকা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় করা হবে ৮০ Elements কোটি ৩৫ লাখ টাকা। সভায় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ নতুন মন্ত্রিসভার সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
একনেক সভায় ‘খুলনা শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন’ প্রকল্পটি তৃতীয়বারের মতো সংশোধনের প্রস্তাব ও মেয়াদ বাড়ানোর আবেদনসহ উপস্থাপন করা হয়। বার বার একই প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির এই চড়া প্রস্তাবে তীব্র বিরক্তি প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, এভাবে জনগণের টাকার অপচয় মেনে নেওয়া হবে না। এই যুক্তিতে প্রকল্পটি অনুমোদন না দিয়ে একনেক সভা থেকে সরাসরি বাতিল করে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
একই সাথে, কার অবহেলা ও অদক্ষতার কারণে প্রকল্পটিতে বার বার মেয়াদ বৃদ্ধির প্রয়োজন হচ্ছে, সেই নেপথ্যের ব্যক্তিকে দ্রুত খুঁজে বের করে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি চলমান অন্যান্য প্রকল্পেরও অতিরিক্ত ও অস্বাভাবিক খরচ বা ব্যয় খতিয়ে দেখে তা কমানোর এবং কঠোর মিতব্যয়িতা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
এছাড়া, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (LGED) এবং গণপূর্ত অধিদপ্তর (PWD) সহ সরকারের বিভিন্ন নির্মাণ বিভাগের ‘রেট সিডিউল’ (কাজের মূল্য নির্ধারণী তালিকা) এক না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। উন্নয়ন কাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তিনি দ্রুততম সময়ের মধ্যে সব বিভাগের রেট সিডিউল একীভূত করার তাগিদ দেন। পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মহাসড়কগুলোর পাশে যেন কোনোভাবেই ক্ষতিকর ইউক্লিপটাস বা ইপিল-ইপিল গাছ না লাগানো হয়।
এদিনের সভায় অনুমোদন পাওয়া ১০টি প্রধান প্রকল্পের খাতওয়ারি বিন্যাস নিচে তুলে ধরা হলো:
| ক্র. নং | প্রকল্পের নাম ও বিবরণ | সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় |
| ১ | চট্টগ্রামের আনোয়ার থেকে কক্সবাজারের ঈদমনি পর্যন্ত আঞ্চলিক মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্প (দিনের বৃহত্তম প্রকল্প) | সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় |
| ২ | বরিশাল সেচ প্রকল্পের রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসন (প্রথম পর্যায়) | পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় |
| ৩ | সমন্বিত উপজেলা ভূমি কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্প | ভূমি মন্ত্রণালয় |
| ৪ | ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের নগর ভবন নির্মাণ প্রকল্প | পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় |
| ৫ | দেশের ৩৩টি জেলার সার্কিট হাউস এবং ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে লিফট সংযোজন প্রকল্প | জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় |
| ৬ | বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট সম্প্রসারণ প্রকল্প-২ | স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় |
| ৭ | ঢাকা সিএমএইচে (CMH) ক্যানসার সেন্টার নির্মাণ (দ্বিতীয় পর্যায়) সংশোধিত প্রকল্প | প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় |
| ৮ | মাদ্রাসা এডুকেশন ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম (MEMIS) সাপোর্ট প্রকল্প (৩য় সংশোধন) | শিক্ষা মন্ত্রণালয় |
| ৯ | দেশের ৬৫৩টি মাদ্রাসায় মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন প্রকল্প (৩য় সংশোধন) | শিক্ষা মন্ত্রণালয় |
| ১০ | বিদ্যমান গ্রিড উপকেন্দ্র ও সঞ্চালন লাইনের ক্ষমতাবর্ধন প্রকল্প (১ম সংশোধন) | বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় |
এ ছাড়া সভায় ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয়ের আরও ছয়টি ছোট প্রকল্প সম্পর্কে একনেক কমিটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৩০টি পৌরসভায় পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন উন্নয়ন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও যানজট নিরসন, ডাকসেবার আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ, ঢাকা সেনানিবাসে অবকাঠামো সম্প্রসারণ, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কর্মসূচির দ্বিতীয় পর্যায় এবং খুলনায় পাইকগাছা কৃষি কলেজ স্থাপন প্রকল্প।
মন্তব্য করুন