

আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস উপলক্ষে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যখন নতুন দিনের প্রত্যাশায় ঘণ্টা বাজে, তখন অনেক কিশোরীর বেঞ্চ পড়ে থাকে খালি। বিবিএস ও ইউনিসেফের ২০২৫ সালের জরিপ অনুযায়ী, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ৪৭ দশমিক ২ শতাংশের প্রথম বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে। একই বছরের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (MICS) অনুযায়ী, ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী মেয়েদের ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ বর্তমানে বিবাহিত। এই পরিসংখ্যান শুধু কিছু সংখ্যার সমষ্টি নয়, এটি হাজারো কিশোরীর স্বপ্নভঙ্গের বেদনা এবং অসমাপ্ত খাতার বাস্তব দলিল।
পরিবারের ভালো চাওয়া, সামাজিক নিরাপত্তা, দারিদ্র্য এবং উপযুক্ত পাত্র হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার ভয়ের কারণে অনেক সময় কিশোরীদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয় সংসারের দায়িত্ব। বিশেষ করে চর, সুন্দরবনসংলগ্ন জনপদ বা প্রান্তিক এলাকায় যাতায়াত ব্যবস্থা ও নিরাপত্তার অভাব অভিভাবকদের দ্রুত বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। কিন্তু একটি মেয়েকে নিরাপদ রাখতে গিয়ে তার শৈশব, শিক্ষা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কেড়ে নেওয়া কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হতে পারে না। এটি মূলত এক ঝুঁকির জায়গা থেকে তাকে অন্য এক অনিশ্চিত ঝুঁকির দিকে ঠেলে দেয়।
শিক্ষার বছর বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাল্যবিবাহের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়। তাই একটি মেয়েকে আরও এক বছর স্কুলে রাখা মানে শুধু পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া নয়, বরং তার পুরো জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া।
শারীরিক ও প্রজননস্বাস্থ্যের দিক থেকেও কৈশোরে বিয়ে ও মাতৃত্বের ঝুঁকি অত্যন্ত মারাত্মক। অল্প বয়সে বিয়ের ফলে কিশোরীরা যেমন তাদের পরিচিত পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তেমনই তাদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশের পথটিও সংকুচিত হয়ে যায়।
বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ বাস্তবায়নে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক এবং সচেতন প্রতিবেশীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ছাত্রী কয়েকদিন ক্লাসে না এলে শিক্ষক যদি তার খোঁজ নেন কিংবা জনপ্রতিনিধি যদি সময়মতো হস্তক্ষেপ করেন, তবে অনেক ক্ষেত্রে একটি মেয়ের জীবন বদলে যেতে পারে। কন্যাশিশু দিবসের মূল সার্থকতা নিহিত রয়েছে দিবসটি পার হওয়ার পরের দিনগুলোতে, যখন আবার স্কুলের ঘণ্টা বাজবে এবং সবিতারা নিরাপদে ক্লাসে ফিরে যেতে পারবে।
আরও পড়ুন: বিশ্বের নজরে বঙ্গোপসাগর, বাড়ছে কৌশলগত গুরুত্ব ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা