

পাবনার ঈশ্বরদীতে অবস্থিত দেশের একমাত্র রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের প্রথম ইউনিটের পারমাণবিক বিক্রিয়া বা ফিশন প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। রবিবার বেলা ৩টা ৩৪ মিনিটে এই বিক্রিয়া শুরু হয়, যা বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের চূড়ান্ত প্রক্রিয়ার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ। এর মাধ্যমে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশ পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের যুগে প্রবেশ করল এবং উৎপাদন শুরুর আরও একধাপ কাছাকাছি এগিয়ে গেল।
প্রকল্প সূত্র জানায়, গত সেপ্টেম্বরেই পারমাণবিক বিকিরণের মাধ্যমে শক্তি উৎপাদন শুরু হওয়ার পরিকল্পনা ছিল। তবে নিরাপত্তা ভালভের পরীক্ষায় ত্রুটি ধরা পড়ায় তা কিছুটা পিছিয়ে যায়। গত সপ্তাহে উচ্চ চাপে দুই দফায় সফলভাবে ভালভের পরীক্ষা সম্পন্ন হয়। সেই পরীক্ষার ফলাফল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করার পর গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়েরা) এই বিক্রিয়া চালুর আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেয়। এরপর শনিবার তিন দিনের প্রস্তুতি শেষে চুল্লিপাত্রে নিয়ন্ত্রিত বিক্রিয়া শুরু হয়।
এনপিসিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাহেদুল হাছান জানান, সফলভাবে নিয়ন্ত্রিত বিক্রিয়া শুরুর মাধ্যমে ১৯৬১ সালে শুরু হওয়া পারমাণবিক ব্যবহারের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হয়েছে। দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতের ইতিহাসে এটি একটি অত্যন্ত গৌরবময় ও ঐতিহাসিক মাইলফলক।
প্রথমবারের মতো রূপপুর প্রকল্পের প্রথম ইউনিটের চুল্লিপাত্র বা রিঅ্যাক্টর সফলভাবে ‘ক্রিটিক্যালিটি’ অর্জন করেছে। এটি বাংলাদেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচির জন্য একটি অত্যন্ত বড় অর্জন। বর্তমানে চুল্লিপাত্রের গুরুত্বপূর্ণ সব মাপকাঠি নির্ধারিত সীমার মধ্যে রয়েছে এবং পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় পরিচালিত হচ্ছে। আগামী ৩০ থেকে ৪০ দিন ধরে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চুল্লিপাত্রের ক্ষমতা বাড়ানোর কাজ চলবে।
কর্মকর্তারা জানান, চুল্লিপাত্রে শক্তি উৎপাদন ক্ষমতা ধাপে ধাপে বেড়ে ৩০ শতাংশে উন্নীত হলেই জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে এই কেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। পরীক্ষামূলক উৎপাদন টানা সাত থেকে আট মাস চলতে পারে। গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়ার মাধ্যমেই বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৩তম পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশের মর্যাদা লাভ করবে। উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের অক্টোবরে প্রকল্প এলাকায় পারমাণবিক জ্বালানি আসার পরই বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক শক্তির অধিকারী দেশের তালিকায় স্থান পায়।
পাবনার এই প্রকল্পটি দেশের ইতিহাসে এককভাবে সবচেয়ে বড় আর্থিক ব্যয়ের প্রকল্প। ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে ১ হাজার মেগাওয়াটের দুটি ইউনিট রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট নির্মাণ করছে। চালুর পর এই কেন্দ্র থেকে ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে এবং প্রতি দেড় বছর পর পর চুল্লিতে নতুন জ্বালানি ভরতে হবে। নির্ধারিত মেয়াদ শেষে ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
আরও পড়ুন: বিশ্বের নজরে বঙ্গোপসাগর, বাড়ছে কৌশলগত গুরুত্ব ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা