আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার সাময়িক যুদ্ধবিরতি বিশ্বজুড়ে যে স্বস্তির সুবাতাস এনে দিয়েছিল, তা খুব বেশিদিন স্থায়ী হলো না। চুক্তি ভেঙে নতুন করে মার্কিন বিমান হামলা এবং ইরানের পাল্টা জবাবের কারণে মধ্যপ্রাচ্য আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ভৌগোলিক দূরত্ব চার হাজার কিলোমিটার হলেও এই যুদ্ধের সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব এসে পড়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। ঢাকার নীতিনির্ধারণী মহলে এখন এটিই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মাত্র দুই দিনের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি দেশের সদ্য ঘোষিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট লক্ষ্যমাত্রাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, মে মাসের তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতি বিবেচনা করে সরকার যেভাবে ভর্তুকি ও মূল্যস্ফীতির হিসাব কষেছিল, বর্তমান বাস্তবতায় তা সম্পূর্ণ ওলটপালট হয়ে যেতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ইতিমধ্যেই বাড়তে শুরু করেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা পরিস্থিতি খুব গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছেন। যদিও তারা এখনই বড় কোনো আতঙ্কের কথা বলছেন না, তবে এই ধারা বজায় থাকলে নতুন বাজেটের পুরো হিসাবনিকাশ বদলে যাবে। সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে ইতিমধ্যেই সরকারের পক্ষ থেকে কিছু খাতের উন্নয়ন ও পরিচালন ব্যয় স্থগিত করা হয়েছে। তবে যুদ্ধের এই চরম অনিশ্চয়তার মাঝে এসব পদক্ষেপ কতটা কাজে আসবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
সবচেয়ে বড় ভয় তৈরি হয়েছে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায়। বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি সামান্য বাড়লেও বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় এক ধাক্কায় অনেক বেড়ে যায়। বর্তমানে তেলের যে দর, তা সরকারের প্রাক্কলিত সীমার বাইরে চলে গেছে। হিসাব অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়তে থাকলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারের ভর্তুকির চাহিদা এক লাফে হাজার হাজার কোটি টাকা বেড়ে যাবে, যা বাজেটে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি করবে।
অন্যদিকে দেশের আয়ের প্রধান দুটি উৎস অর্থাৎ তৈরি পোশাক খাত এবং প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সও নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়েছে। লোহিত সাগর ও মধ্যপ্রাচ্যের নৌপথে অস্থিরতার কারণে পণ্যবাহী জাহাজগুলোকে এখন অনেক দীর্ঘ পথ ঘুরে যাতায়াত করতে হবে। এর ফলে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ইউরোপ বা আমেরিকায় পণ্য পৌঁছাতে অতিরিক্ত ১৫ দিন পর্যন্ত বেশি সময় লেগে যেতে পারে। যাতায়াত পথ বেড়ে যাওয়ায় জাহাজের ভাড়াও এক ধাক্কায় প্রায় অর্ধেক বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের কারণে এমনিতেই দেশের পোশাক কারখানাগুলোর উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। তার ওপর যাতায়াত ব্যয় ও সময় বৃদ্ধি পেলে রপ্তানি বাণিজ্য চরম সংকটে পড়বে। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের এই নতুন সংঘাত বাংলাদেশের পুরো সামষ্টিক অর্থনীতিকে এক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
মন্তব্য করুন