কয়েক দিন আগেই ফ্রান্সের ভার্সাই শহরে এক জমকালো নৈশভোজের পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি প্রাথমিক সমঝোতা সই হয়েছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত আশাবাদী হয়ে বলেছিলেন, এটি ইরানের জন্য একটি দারুণ চুক্তি। বছরের পর বছর নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত ইরান এই চুক্তির মাধ্যমে শত শত কোটি ডলারের তেল বিক্রির সুযোগ পাবে এবং পশ্চিমা ব্যাংকগুলোর সঙ্গে ডলারে লেনদেন করতে পারবে। ট্রাম্পের ধারণা ছিল, অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার এই সুযোগ ইরান হাতছাড়া করবে না। তবে বাস্তব পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ নিয়েছে।
চুক্তি সইয়ের এক মাস পার হওয়ার আগেই হরমুজ প্রণালির বাইরে তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে রহস্যময় হামলা হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প প্রশাসন ইরানকে দেওয়া তেলের বিশেষ ছাড় বাতিল করে দেয়। এরপর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, যখন মার্কিন বাহিনী টানা দুই রাত ধরে ইরানের ১৭০টির বেশি সামরিক ঘাঁটিতে ব্যাপক বিমান হামলা চালায়। দুই পক্ষ প্রথমে ৬০ দিনের মধ্যে একটি স্থায়ী ও বড় চুক্তিতে পৌঁছানোর বিষয়ে একমত হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই আলোচনার সব পথ বন্ধ হয়ে গেছে।
প্রাথমিক চুক্তি ব্যর্থ হওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে বিকল্প কোনো ভালো পরিকল্পনা আছে বলে মনে হচ্ছে না। তারা আবারও সেই পুরনো পথেই হাঁটছেন, যা হলো অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক শক্তি প্রয়োগ। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালানো হলে তার কঠোর জবাব দেওয়া হবে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ও বিমান হামলার কৌশল অতীতেও কোনো স্থায়ী সমাধান আনতে পারেনি এবং এবারও নতুন কিছু হওয়ার সম্ভাবনা কম।
কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ওয়াশিংটন ও তেহরান এখন এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে যেখান থেকে সামনে এগোনোর কোনো পথ নেই। যুক্তরাষ্ট্র যত বেশি হামলা চালাবে, ইরানও উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে তত বেশি পাল্টা আঘাত হানবে। ট্রাম্প প্রথমে ভেবেছিলেন সামরিক চাপ দিয়ে ইরানের সরকার পতন ঘটাবেন অথবা তাদের আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করবেন, কিন্তু তার কোনোটিই কাজ করেনি।
এদিকে ইরান নিজের দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনে নাকাল। সম্প্রতি তেহরানে এক হামলায় নিহত দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শোকযাত্রায় অংশ নিয়ে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ও প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সাধারণ মানুষের ক্ষোভের মুখে পড়েন। উগ্রপন্থী জনতা তাদের দিকে পাথর ছোঁড়ে এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মাথা নত করার অভিযোগ আনে।
বর্তমানে ইরানের শাসনভার মূলত যার হাতে যাচ্ছে, তিনি হলেন নিহত সর্বোচ্চ নেতার ছেলে মোজতবা খামেনি। ট্রাম্প প্রথমে ইরানের এই নতুন নেতৃত্বকে কিছুটা যুক্তিমনস্ক ভাবলেও, সম্প্রতি তুরস্কের আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে তিনি সুর বদলে তাদের বাজে লোক বলে আখ্যা দিয়েছেন।
বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে মূল বিরোধের জায়গা দুটি। প্রথমটি হলো ইরানের পারমাণবিক জ্বালানির নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে। আর দ্বিতীয়টি হলো হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ। প্রাথমিক চুক্তির একটি অস্পষ্ট ধারার সুযোগ নিয়ে ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে যাতায়াত করা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর মাশুল বা ট্যাক্স বসানোর পরিকল্পনা করছে। মার্কিন নৌবাহিনী এর বিরোধিতা করে জাহাজগুলোকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যেতে শুরু করলে ইরান পাল্টা গুলি চালায়। এর ফলে ওই রুট দিয়ে বর্তমানে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট এখন আর কোনো সাধারণ স্তরের আলোচনা দিয়ে সমাধান সম্ভব নয়। এটি সম্পূর্ণ একটি রাজনৈতিক লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে, যার শেষ কোথায় তা কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারছে না।
মন্তব্য করুন