বাংলাদেশ এখন একটা কঠিন সময় পার করছে। চার বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ধীর প্রবৃদ্ধি, বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা, রাজস্ব ঘাটতি, খেলাপি ঋণ, ব্যাংকে তারল্যসংকট আর জ্বালানি সমস্যা একসঙ্গে চেপে ধরেছে অর্থনীতিকে। এই ভারী বাস্তবতার মধ্যেই ঘোষণা হয়েছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট। বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬.৫ শতাংশ, মূল্যস্ফীতি নামানোর প্রতিশ্রুতি ৭.৫ শতাংশে, রাজস্ব আয় বাড়ানোর লক্ষ্য ১৮.২ শতাংশের বেশি। সংখ্যাগুলো দেখলে আশা জাগে। কিন্তু সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুন প্রশ্ন তুলছেন, এই লক্ষ্যগুলো কি আসলেই অর্জনযোগ্য?
বিদায়ী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪.১৪ শতাংশ। এক অর্থবছরে সেখান থেকে ৬.৫ শতাংশে পৌঁছাতে হলে বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানিতে একসঙ্গে বড় উল্লম্ফন দরকার। অথচ প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি বেসরকারি বিনিয়োগ এক দশকের বেশি সময় ধরে একটি জায়গায় আটকে। মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রেও একই কথা। বিদায়ী অর্থবছরে জুলাই থেকে মে পর্যন্ত গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৬৩ শতাংশ। ফাহমিদা খাতুন বলছেন, বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি এখন আর কেবল মুদ্রানীতির বিষয় নয়, এটি কাঠামোগত সমস্যায় পরিণত হয়েছে। খাদ্যপণ্যের উচ্চমূল্য, জ্বালানি খরচ, বিনিময় হারের ওঠানামা ও বাজারব্যবস্থার দীর্ঘদিনের অদক্ষতা মিলিয়ে মূল্যস্ফীতিকে ধরে রাখছে। কেবল সুদের হার বাড়িয়ে এই আগুন নেভানো যাবে না।
রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যটিও বেশ ভারী। এক দশক ধরে বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে, বিদায়ী অর্থবছরেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকঋণের ওপর বেশি নির্ভর করলে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ চাপে পড়বে। আর বৈদেশিক অনুদান কমতে থাকায় ভবিষ্যতে ঋণনির্ভরতা আরও বাড়বে, যা দীর্ঘমেয়াদে একটি গভীর ঝুঁকি।
বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষায় বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির সম্প্রসারণ ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে এর সুফল পেতে হলে সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে। ড. ফাহমিদা খাতুনের মূল বক্তব্য হলো, বাজেটটি একটি আশাবাদী পরিস্থিতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কাঠামোগত সংস্কার, শক্তিশালী রাজস্ব প্রশাসন, সুশাসন ও বেসরকারি খাতের আস্থা ফেরানো ছাড়া বাজেটের লক্ষ্যগুলো কাগজেই থেকে যাবে। প্রতিটি টাকা যেন দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনে বাস্তব ফল আনে, সেটি নিশ্চিত করতে জবাবদিহির কোনো বিকল্প নেই।
মন্তব্য করুন