
ঢাকা: এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণাধীন সময়ে শরিয়াভিত্তিক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে কোনো ধরনের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বা পরীক্ষা ছাড়াই ৮,৫৪২ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে, যা দেশের ব্যাংক খাতের সুশাসন ও নিয়োগ প্রক্রিয়ার ভঙ্গুর অবস্থাকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সংঘটিত এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রচলিত মানবসম্পদ নীতিমালা ও ব্যাংকিং নিয়মনীতি ব্যাপকভাবে লঙ্ঘন করা হয়েছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সময় চট্টগ্রাম অঞ্চলে ব্যাংকটির মাত্র ৬৬ জন কর্মকর্তা ছিলেন। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় এস আলম গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৮,০৯৯ জনে। এর মধ্যে শুধু পটিয়া উপজেলা থেকেই ৫,১৪৮ জন কর্মকর্তা নিয়োগ পান, যা সমগ্র নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আঞ্চলিক পক্ষপাতিত্বের স্পষ্ট প্রমাণ বহন করে। বিজ্ঞপ্তি বা লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই এসব প্রার্থী সংগ্রহের জন্য এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যানের পটিয়াস্থ বাড়ি এবং চট্টগ্রামের আসাদগঞ্জ অফিসে বিশেষ বাক্স রাখা হতো, যেখান থেকে সিভি সংগ্রহ করে প্রধান কার্যালয়ের মাধ্যমে নিয়োগপত্র ইস্যু করা হতো।
ইসলামী ব্যাংকের পূর্বের মানবসম্পদ নীতিমালা অনুযায়ী যেকোনো পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে মেধাক্রম যাচাই করার বাধ্যবাধকতা ছিল। কিন্তু তৎকালীন ব্যবস্থাপনা কতৃপক্ষ জরুরি প্রয়োজনের অজুহাতে সেই নীতিমালা শিথিল করে সরাসরি এন্ট্রি গ্রেডে বিপুলসংখ্যক জনবল নিয়োগ দেয়। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এস আলম আমলের নিয়োগপ্রাপ্তদের জন্য বিশেষ যোগ্যতা মূল্যায়ন পরীক্ষার আয়োজন করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর অধীনে অনুষ্ঠিত এই পরীক্ষায় অনেকেই অংশ না নেওয়ায় এবং শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাদের চাকরিচ্যুত করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, ইসলামী ব্যাংকের চাকরিচ্যুত কর্মকর্তাদের নিয়োগ ও চাকরিচ্যুতির প্রতিটি প্রক্রিয়া অত্যন্ত সতর্কতার সাথে খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।
বর্তমানে এই নিয়োগ অনিয়ম ও চাকরিচ্যুতির ঘটনা নিয়ে ব্যাংক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। চাকরিচ্যুত কর্মীরা আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন এবং আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন ব্যাংক খাতের অভ্যন্তরীণ অনিয়ম রোধে কঠোর দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে বাংলাদেশ ব্যাংক আরও কড়া নজরদারি বজায় রাখবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
মন্তব্য করুন
ব্রেকিং নিউজ ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের তাৎক্ষণিক আপডেট পেতে নোটিফিকেশন অন করুন।