
ঢাকা: দেশের সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাত্র ১ হাজার ৪৮৫টি শূন্য পদের বিপরীতে ২১ লাখ ২৩ হাজারেরও বেশি আবেদন জমা পড়েছে, যা সরকারি চাকরির তীব্র প্রতিযোগিতার ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন ঘটনা। গত মে মাসে প্রকাশিত এই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে ১৩ থেকে ২০তম গ্রেডের ৫২ ক্যাটাগরির পদের বিপরীতে গত ২ জুন থেকে ২৩ জুন পর্যন্ত অনলাইনে আবেদন গ্রহণ করা হয়। আবেদন প্রক্রিয়া শেষে প্রতি পদের বিপরীতে প্রার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় ১ হাজার ৪৩০ জনে, যা সাধারণ বিসিএস পরীক্ষার চেয়েও বহুগুণ বেশি। বেসরকারি খাতে চাকরির সুযোগ সংকুচিত হয়ে আসায় চাকরিপ্রার্থীরা এখন সরকারি খাতের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
বেসরকারি খাতের এই স্থবিরতা ও কর্মসংস্থানের সংকট নতুন নয়। গত বছরের আগস্টে প্রকাশিত এক গবেষণায় পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বর্তমান শ্রমবাজারের দশাকে কর্মসংস্থান জরুরি অবস্থা হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে উচ্চমাধ্যমিক বা বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিধারী তরুণদের প্রায় ৩৬ শতাংশই বর্তমানে বেকার। এমন বাস্তবতায় সমাজসেবা অধিদপ্তরের সামান্য কিছু পদের জন্য লাখ লাখ তরুণের হুমড়ি খেয়ে পড়া প্রমাণ করে যে, দেশের তরুণ সমাজ চাকরির নিরাপত্তা ও নিশ্চিত বেতনের জন্য কতটা মরিয়া হয়ে উঠেছে।
আবেদনকারীর সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেশি হওয়ায় বিপুলসংখ্যক প্রার্থীর পরীক্ষা গ্রহণ নিয়ে বড় ধরনের লজিস্টিক ও আর্থিক সংকটে পড়েছে সমাজসেবা অধিদপ্তর। পরীক্ষা কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন এবং উত্তরপত্র মূল্যায়ন নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ায় অধিদপ্তর দ্রুততম সময়ে নিয়োগ সম্পন্ন করার উপায় বের করতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ও নির্দেশনা চেয়েছে। সমাজকল্যাণ সচিব মোহাম্মদ আবু ইউসুফ এ বিষয়ে জানান যে, উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং স্বচ্ছতা বজায় রেখে দ্রুত নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করতে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সহায়তা কামনা করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি চাকরিতে এই অতিরিক্ত আবেদন দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে না। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, কর্পোরেট খাতের সম্প্রসারণ না হওয়া এবং নতুন বিনিয়োগের খরা থাকার কারণে প্রার্থীরা বাধ্য হয়ে সরকারি পদের দিকে ঝুঁকছেন। জুলাই মাসে বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি মাত্র ৪ দশমিক ৬২ শতাংশে আটকে থাকায় নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। বিডিজবসের তথ্যানুযায়ী, গত কয়েক বছর ধরেই বেসরকারি খাতে চাকরির বিজ্ঞপ্তির সংখ্যা ক্রমাগত কমছে, যা শ্রমবাজারকে আরও সংকুচিত করছে।
এই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে সবচেয়ে বেশি পদ রয়েছে অফিস সহায়ক ও ইউনিয়ন পর্যায়ের সমাজকর্মী পদে, যেখানে শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে এসএসসি থেকে শুরু করে স্নাতক ডিগ্রি পর্যন্ত চাওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও বাজার চাহিদার বড় ধরনের অসামঞ্জস্যের কারণে তরুণরা কেবল গতানুগতিক চাকরির পেছনে ছুটছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারি প্রশাসনকে এ ধরনের বিশাল নিয়োগ প্রক্রিয়া ব্যবস্থাপনার জন্য আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর উপায় বের করতে হবে, অন্যথায় বেকারত্ব ও কর্মসংস্থানের এই চাপ সামাল দেওয়া আরও দুরূহ হয়ে পড়বে।
মন্তব্য করুন
ব্রেকিং নিউজ ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের তাৎক্ষণিক আপডেট পেতে নোটিফিকেশন অন করুন।