পারিবারিক বিরোধ আর অন্ধ আক্রোশের বলি হতে হয়েছিল মাত্র ৭ বছর বয়সী এক নিষ্পাপ শিশুকে। দীর্ঘ প্রায় এক দশক পর অবশেষে সেই চাঞ্চল্যকর ও মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার পেল নিহতের পরিবার।
চট্টগ্রাম নগরের বন্দর টোল রোড এলাকায় শিশু মো. মাহফুজকে গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যার দায়ে তার খালু আল আমিনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) চট্টগ্রামের দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ নিশাদুজ্জামান এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন।
রায়ের বিস্তারিত
আদালত সূত্রে জানা যায়, নির্মম এই হত্যাকাণ্ডের দায়ে অভিযুক্ত আল আমিনকে মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি ২৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এখানেই শেষ নয়; হত্যার পর আলামত গোপন করা এবং লাশ গুম করার অপরাধে তাকে আরও ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা অনাদায়ে তাকে আরও দুই মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
দণ্ডপ্রাপ্ত আল আমিন কিশোরগঞ্জ জেলার নিকলী থানার কারপাশা পুতিহারা এলাকার বাসিন্দা। পেশায় তিনি একজন রিকশাচালক।
যে কারণে এই নির্মম প্রতিশোধ
আদালতের নথি ও মামলার বিবরণী থেকে জানা যায় এক করুণ গল্প। নিহত মাহফুজ হালিশহর হাউজিং এস্টেট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির ছাত্র ছিল। মাহফুজের মা সীমা এবং ঘাতক আল আমিনের স্ত্রী আপন দুই বোন।
পারিবারিক জীবনে আল আমিন সন্দেহ করতেন যে, তার স্ত্রীর সঙ্গে মাহফুজের বাবা মাহবুবের অনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। এছাড়া, মাহবুবের কাছ থেকে ধার নেওয়া মাত্র সাড়ে তিন হাজার টাকা সময়মতো পরিশোধ করতে না পারায় আল আমিনকে মারধরের শিকার হতে হয়। এসব ঘটনার পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও প্রতিশোধস্পৃহা থেকেই তিনি নিষ্পাপ শিশু মাহফুজকে হত্যার ভয়ংকর পরিকল্পনা করেন।
সেদিনের সেই মর্মান্তিক ঘটনা
ঘটনাটি ঘটেছিল ২০১৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর। সকালে শিশু মাহফুজকে ‘সাগর দেখানোর’ প্রলোভন দেখিয়ে টোল রোডের গলাচিপা এলাকায় নিয়ে যান আল আমিন। সেখানে গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হলেও শিশুটি বাড়ি না ফেরায় শুরু হয় খোঁজাখুঁজি। পরে পুলিশ খবর পেয়ে ওই এলাকা থেকে শিশুটির নিথর দেহ উদ্ধার করে। আটকের পর পুলিশের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদে আল আমিন নিজেই এই হত্যাকাণ্ডের রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়ে দোষ স্বীকার করেন।
দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের অবসান
সন্তান হারানোর পর মাহফুজের বাবা মাহবুব বাদী হয়ে বন্দর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। ২০১৭ সালের ২৭ এপ্রিল আসামির বিরুদ্ধে আদালতে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করা হয়। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ায় ১২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ও চুলচেরা বিশ্লেষণ শেষে ঘটনার প্রায় ১০ বছর পর আদালত এই চূড়ান্ত রায় প্রদান করলেন।
এই রায়ের মাধ্যমে কেবল একটি জঘন্য অপরাধেরই শাস্তি নিশ্চিত হলো না, বরং এটি সমাজে একটি কঠোর বার্তাও দিয়ে গেল যে, অপরাধী যতই চতুর হোক না কেন, আইনের হাত থেকে তার নিস্তার নেই।
মন্তব্য করুন