সময়টা ছিল ২০২১ সালের শেষের দিকে। টিউশনির জমানো টাকা দিয়ে যখন জীবনের প্রথম ল্যাপটপটি হাতে পেয়েছিলেন মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার প্রত্যন্ত গ্রামের তরুণ সাইফুর রহমান, তখন আনন্দের চেয়েও তার চোখে ছিল এক বুক স্বপ্ন। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হিসেবে সেই ল্যাপটপটি কেবল কোনো যন্ত্র ছিল না, সেটি ছিল তার ভাগ্য বদলানোর এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পা রাখার প্রথম হাতিয়ার।
আজ ২০২৬ সালে এসে সাইফুর একজন সফল ফ্রিল্যান্সার এবং উদীয়মান উদ্যোক্তা। গুগল অ্যাডস ও ওয়েব অ্যানালিটিকস নিয়ে কাজ করে ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসগুলো থেকে তিনি এ পর্যন্ত প্রায় এক লাখ মার্কিন ডলার আয় করেছেন, যা বাংলাদেশি টাকায় কোটি টাকারও বেশি। তবে এই অভাবনীয় সাফল্যের পেছনের পথটা মোটেও সহজ ছিল না।
আবদুল লতিফ ও শিপা খানম দম্পতির ছেলে সাইফুর পড়াশোনা শেষ করে আর দশটা যুবকের মতোই চাকরির বাজারে নেমেছিলেন। ২০২২ সালে মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ থেকে বিবিএ সম্পন্ন করার পর বেশ কয়েকটি ইন্টারভিউ দিলেও কোথাও কাঙ্ক্ষিত সুযোগ মিলছিল না। তবে প্রথাগত ৯টা থেকে ৫টার গণ্ডিবদ্ধ চাকরিতে তার মন সায় দিচ্ছিল না। তিনি চেয়েছিলেন নিজের মেধা ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে বড় কিছু করতে।
বিবিএ পড়ার সময়ই তিনি আইটি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট স্কিলআপার থেকে গুগল অ্যাডস এবং ওয়েব অ্যানালিটিকসের মতো আধুনিক প্রযুক্তির কাজ শেখা শুরু করেন। ল্যাপটপ কেনার সামর্থ্য না থাকায় টিউশনি করে টাকা জমান। কাজ শেখার জন্য দিন-রাত এক করে কঠোর পরিশ্রম করেন তিনি।
প্রশিক্ষণ শেষে ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস আপওয়ার্কে কাজ খোঁজা শুরু করেন সাইফুর। শুরুতে দিনের পর দিন কোনো সাড়া না পেয়ে হতাশ হলেও হাল ছাড়েননি। অবশেষে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত, যখন তিনি প্রতি ঘণ্টায় মাত্র আট ডলারের একটি কাজ পান। প্রথম কাজে নিজের শতভাগ উজাড় করে দেওয়ায় সেই একই ক্লায়েন্ট পরবর্তীতে তাকে ৮০০ ডলারের বড় প্রজেক্ট দেন। এর মাত্র চার মাসের মাথায় আপওয়ার্কে টপ রেটেড ফ্রিল্যান্সারের স্বীকৃতি পান তিনি। ফ্রিল্যান্সিংয়ের এই ব্যস্ততার মাঝেই ২০২৫ সালে সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে সফলভাবে এমবিএ সম্পন্ন করেন সাইফুর।
যে ছেলের একসময় ল্যাপটপ কেনার টাকা ছিল না, আজ তার কাজের টেবিলে শোভা পায় ম্যাকবুক আর পকেটে থাকে আইফোন। ফ্রিল্যান্সিংয়ের আয় দিয়ে নিজের ও দুই বোনের পড়াশোনার খরচ চালানোর পাশাপাশি পরিবারকে একটি সুন্দর নতুন বাড়িও উপহার দিয়েছেন তিনি। তবে সাইফুরের কাছে নিজের এই বিলাসবহুল জীবন বা উপার্জনের চেয়েও বড় সম্পদ তার মায়ের মুখের তৃপ্তির হাসি। মা এখন গর্ব করে বলেন যে তার ছেলে তাদের স্বপ্ন পূরণ করেছে। সাইফুরের ভাষায়, মায়ের মুখের এই হাসিটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় রেমিট্যান্স।
বর্তমানে সিলেট শহরের শিবগঞ্জ এলাকায় নিজের একটি ছোট এজেন্সি গড়ে তুলেছেন সাইফুর। সেখানে আরও দুজন তরুণকে সাথে নিয়ে কাজ করছেন এবং তাদের দক্ষ করে তুলছেন। দেশের বেকার তরুণ-তরুণীদের উদ্দেশ্যে সাইফুর বলেন, সঠিক দিকনির্দেশনা, একটি ল্যাপটপ, ইন্টারনেট সংযোগ আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে যে কেউ ফ্রিল্যান্সিংয়ে সফল হতে পারে। সঠিক দক্ষতা অর্জন করতে পারলে সাফল্য আসবেই।
মন্তব্য করুন