বাংলাদেশে বজ্রপাত এখন আর কেবল একটি প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, বরং এটি একটি বড় জননিরাপত্তা সংকটে রূপ নিয়েছে। গত এক যুগে দেশে ৩ হাজার ৮৬০ জন মানুষ বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন। সচেতনতা ও উন্নত প্রযুক্তি সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে মৃত্যুর মিছিল থামাতে হিমশিম খাচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বঙ্গোপসাগর থেকে আসা গরম ও আর্দ্র বায়ু এবং উত্তর দিকের ঠান্ডা বায়ুর সংমিশ্রণে এখন আগের চেয়ে বেশি শক্তিশালী বজ্রমেঘ তৈরি হচ্ছে। মূলত হাওরাঞ্চল ও উন্মুক্ত মাঠের কৃষকেরা এই দুর্যোগের প্রধান শিকার। নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের মতো এলাকাগুলো এখন বজ্রপাতের ‘হটস্পট’ হিসেবে পরিচিত। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি ১ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় বজ্রপাতজনিত মৃত্যুহারে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বে শীর্ষে।
২০১৬ সালে বজ্রপাতকে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করা হলেও মৃত্যুর সংখ্যা এখনো উদ্বেগজনক। গত ১২ বছরের সরকারি উপাত্ত নিচে দেওয়া হলো:
| সাল | নিহতের সংখ্যা |
| ২০১৫ | ২২৬ |
| ২০১৬ | ৩৯১ |
| ২০১৭ | ৩৮৮ |
| ২০১৮ | ৩৫৯ |
| ২০১৯ | ৪০১ |
| ২০২০ | ৪২৭ |
| ২০২১ | ৩৬৩ |
| ২০২২ | ৩৩৭ |
| ২০২৩ | ৩২২ |
| ২০২৪ | ২৭১ |
| ২০২৫ | ২৪৩ |
| ২০২৬ (১৪ জুন পর্যন্ত) | ১৩২ |
বর্তমানে আবহাওয়া অধিদপ্তর ও রাইমস (RIMES) স্যাটেলাইট প্রযুক্তির সাহায্যে ১ থেকে ৪ ঘণ্টা আগেই বজ্রপাতের পূর্বাভাস দিতে পারছে। কিন্তু মূল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই তথ্য প্রান্তিক কৃষক বা জেলেদের কাছে সময়মতো পৌঁছে দেওয়া। স্মার্টফোন বা ইন্টারনেটের সীমিত ব্যবহারের কারণে অনেকেই এই আগাম সতর্কবার্তা সম্পর্কে জানতে পারেন না। যদিও সরকার ঝুঁকিপূর্ণ ১৫ জেলায় প্রায় ৬ হাজার ৭০০টি নতুন বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা ও ৩ হাজার ৫০০টি ‘কৃষক ছাউনি’ নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে, তবে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে আগের অনেক বজ্রনিরোধক দণ্ডই এখন অকার্যকর।
বজ্রপাত নিয়ে সমাজে আজও নানা কুসংস্কার প্রচলিত। বিশেষজ্ঞরা বজ্রপাত থেকে বাঁচতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন:
মোবাইল বা হাতঘড়ির ভয়: মোবাইল বা ঘড়ি বজ্রপাত আকর্ষণ করে—এই ধারণাটি ভুল।
সাহায্যের সঠিক পদ্ধতি: বজ্রপাতে আক্রান্ত ব্যক্তিকে স্পর্শ করলে নিজেও আক্রান্ত হওয়ার ভয় নেই। বরং আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে সিপিআর (CPR) দিলে প্রাণ বাঁচানো সম্ভব।
নিরাপদ হওয়ার উপায়: বজ্রধ্বনি শোনামাত্রই খোলা মাঠ ছেড়ে পাকা দালানে আশ্রয় নিতে হবে। যদি আশ্রয়ের সুযোগ না থাকে, তবে মাটিতে না শুয়ে শরীর সংকুচিত করে নিচু হয়ে বসে দুই হাতে কান চেপে ধরতে হবে।
৩০ মিনিটের নিয়ম: সর্বশেষ বজ্রধ্বনি শোনার পর অন্তত ৩০ মিনিট নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে হবে।
বজ্রপাতের প্রাণহানি কমাতে প্রযুক্তিনির্ভর সতর্কবার্তার পাশাপাশি গ্রামীণ পর্যায়ে কুসংস্কার দূর করে বৈজ্ঞানিক সচেতনতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।
মন্তব্য করুন