আওয়ামী লীগের ইতিহাসে অনেক প্রত্যাবর্তন দিবস থাকলেও, এবার দলটির সভাপতি শেখ হাসিনা ‘সঠিকভাবে তার নিজ দেশে’ প্রত্যাবর্তন করেছেন বলে তীক্ষ্ণ মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
শনিবার (৮ আগস্ট) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) সাদা দল ও ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইউট্যাব) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। সভার মূল প্রতিপাদ্য ছিল ফ্যাসিস্ট সরকার পতনে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ভূমিকা’।
আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কৌশলের সমালোচনা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, "চেতনা বিক্রির রাজনীতি বাংলাদেশে চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়েছে। একাত্তরের চেতনা বিক্রি করতে করতেই শেখ হাসিনার রাজনৈতিক মৃত্যু হয়েছে ঢাকায়, আর তার দাফন হয়েছে দিল্লিতে।"
তিনি স্পষ্ট করে জানান, একটি রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ এখন আদালতের রায়ের ওপর নির্ভরশীল। পাশাপাশি শেখ হাসিনা ও তার দোসরদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় একাধিক মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।
সাম্প্রতিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সাফল্য কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তির একক কৃতিত্ব নয় বলে মন্তব্য করেন সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, "৫ আগস্টের ঘটনা কোনো একদিনের হঠাৎ আন্দোলনের ফল নয়, এটি দীর্ঘ ১৭ বছরের নিরবচ্ছিন্ন গণতান্ত্রিক সংগ্রামের চূড়ান্ত ফসল।"
বিএনপির ভূমিকা: তিনি জানান, শুরু থেকেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতি বিএনপির পূর্ণ সমর্থন ছিল এবং রাজনৈতিক পরিচয় আড়ালে রেখেই তারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছিল।
টার্নিং পয়েন্ট: যখন এই আন্দোলনে শিক্ষক, শ্রমিক ও সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়, তখন তা অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। বিশেষ করে শহীদ আবু সাঈদের আত্মত্যাগ এই আন্দোলনের গতিপথ পুরোপুরি পাল্টে দেয় বলে তিনি স্মরণ করেন।
প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত, সে বিষয়েও কড়া বার্তা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার সম্পর্ক হতে হবে সম্পূর্ণ পারস্পরিক মর্যাদা, সম্মান এবং সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে।
ভারতে বসে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পাওয়াকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য ‘উদ্বেগজনক’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, "ভারত যদি বাংলাদেশের বৈধভাবে গঠিত সরকারের প্রতি সত্যিকার অর্থে সম্মান দেখাতে চায়, তবে পলাতক একজন সাবেক শাসককে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া তাদের উচিত নয়।"
ভবিষ্যতে দেশে যেন আর কোনো নির্বাচিত সরকার স্বৈরাচারী রূপ নিতে না পারে, সেজন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক সংস্কারের প্রস্তাব তুলে ধরেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তার প্রস্তাবিত সংস্কারগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: ১. প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ নির্দিষ্টকরণ: প্রধানমন্ত্রী পদে কোনো ব্যক্তির দায়িত্ব পালনের সীমা সর্বোচ্চ ১০ বছর নির্ধারণ করা। ২. রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের দলীয় প্রভাবমুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ দেওয়া। ৩. দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ: ক্ষমতার সুষ্ঠু ভারসাম্য নিশ্চিত করতে জাতীয় সংসদকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট কাঠামোতে রূপান্তর করা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা শুরু করা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে, বিশেষ করে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং আসন্ন রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা নিয়ে।
মন্তব্য করুন