
১৬৫৬ সালে মুঘল সম্রাট শাহজাহানের রাজকীয় অনুমোদনে বাংলা প্রদেশের হুগলি নদীর পশ্চিম তীরে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের প্রথম কারখানা স্থাপনের সুযোগ পায়। এই বাণিজ্যিক উদ্যোগের আড়ালে কোম্পানি দ্রুত তাদের সামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে, যা শেষ পর্যন্ত ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ এবং ১৭৬৪ সালের বক্সারের যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলার সার্বভৌমত্ব বিলুপ্তির পথ প্রশস্ত করে।
সপ্তদশ শতাব্দীর শেষে জোব চার্নকের নেতৃত্বে সুতানটি, গোবিন্দপুর ও দিহি-কালকুট্টা গ্রাম নিয়ে ব্রিটিশদের বসতি স্থাপনের পর থেকেই বাংলার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কোম্পানির অনুপ্রবেশ ঘটে। নবাব আলিবর্দী খানের মৃত্যুর পর সিরাজ-উদ-দৌলা ক্ষমতায় বসলে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র ও কোম্পানির অবৈধ বাণিজ্যিক তৎপরতা চরম আকার ধারণ করে। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর প্রান্তরে মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় নবাবের পরাজয় ও হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বাংলায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সিংহদ্বার উন্মোচিত হয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মোগল সাম্রাজ্যের পতনোন্মুখ সময়ে ইংরেজ বণিকরা অত্যন্ত বিনম্রভাবে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল, কিন্তু পরবর্তীতে তারাই উদ্ধত ঔপনিবেশিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়।
মীর জাফর ও মীর কাশিমের সঙ্গে কোম্পানির বিরোধের চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে ১৭৬৪ সালের বক্সারের যুদ্ধে। এই যুদ্ধে নবাব মীর কাশিম, অউধের নবাব সুজাউদ্দৌলা ও দিল্লির সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের যৌথ বাহিনী পরাজিত হয়। এর ফলে ব্রিটিশ কোম্পানি বাংলার ওপর চূড়ান্ত প্রশাসনিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। ১৭৬৫ সালের আগস্ট মাসে ঐতিহাসিক এলাহাবাদ চুক্তির মাধ্যমে কোম্পানি বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি বা রাজস্ব আদায়ের পূর্ণ অধিকার লাভ করে।
ইতিহাসবিদ বিপান চন্দ্রের মতে, এই সময়কালটি ছিল ব্রিটেনের শিল্প বিপ্লবের সূচনালগ্ন। একদিকে ব্রিটেন পুঁজিতান্ত্রিক দেশ হিসেবে বিকশিত হতে থাকে, অন্যদিকে ভারতবর্ষ অনুন্নয়নের পথে অগ্রসর হয়ে একটি পশ্চাৎপদ ঔপনিবেশিক দেশে পরিণত হয়। এই ঐতিহাসিক রূপান্তরই আধুনিক দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর ভিত্তি তৈরি করেছিল।
মন্তব্য করুন
ব্রেকিং নিউজ ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের তাৎক্ষণিক আপডেট পেতে নোটিফিকেশন অন করুন।