জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে ঝুঁকছে বাংলাদেশ। আর এই রূপান্তরের সুফল সরাসরি পড়তে শুরু করেছে দেশের অর্থনীতিতে। উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোট (ক্লিন)-এর সাম্প্রতিক এক গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, জাতীয় গ্রিডে যুক্ত প্রতিটি নতুন মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ থেকে বছরে দেশের ৫ কোটিরও বেশি টাকা সাশ্রয় হচ্ছে। মূলত বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং ব্যয়বহুল জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানির প্রয়োজনীয়তা হ্রাস পাওয়ার কারণেই এই বিপুল পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় করা সম্ভব হচ্ছে।
গত আট বছরে দেশে সৌরবিদ্যুৎ থেকে মোট ৩ হাজার ২৩০ গিগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে। এর ফলে সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে ২ হাজার ৬৪২ কোটি টাকা এবং জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি বাবদ ৫ হাজার ৩১৩ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে। সব মিলিয়ে গত আট বছরে দেশের অর্থনীতিতে প্রায় ৭ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকার ইতিবাচক প্রভাব এসেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রতি মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ বছরে গড়ে ২ কোটি টাকা উৎপাদন খরচ বাঁচায় এবং ৩ দশমিক ১১ কোটি টাকার জ্বালানি আমদানির চাপ কমায়।
অর্থনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায়ও সৌরবিদ্যুৎ এক অভূতপূর্ব ভূমিকা রাখছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বিদ্যমান সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর কারণে গত আট বছরে ২২ লাখ ৫০ হাজার টনের বেশি কার্বন নিঃসরণ এবং ৪৮ হাজার ৪০৩ টন ক্ষতিকর বায়ুদূষণ প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে। এই দূষণগুলোর মধ্যে সালফার অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড ও সিসার মতো বিষাক্ত উপাদান রয়েছে, যা মানুষের শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ এবং ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। ফলে সৌরবিদ্যুতের সম্প্রসারণ দেশের চিকিৎসা খাতের ওপর থেকেও বড় একটি চাপ কমিয়ে দিচ্ছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রযুক্তির মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ অন্যতম প্রতিযোগিতামূলক ও সাশ্রয়ী মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যেখানে এইচএফও (HFO)-ভিত্তিক বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় ছিল ইউনিটপ্রতি ২৭ দশমিক ৩৬ টাকা, সেখানে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় ছিল মাত্র ১৫ দশমিক ৫৪ টাকা। ক্লিনের প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী বলেন, সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ মূলত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। এই খাতের টেকসই উন্নয়নের জন্য ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের অন্তত ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের বাধ্যতামূলক লক্ষ্য নির্ধারণ এবং সৌর সরঞ্জামের ওপর থেকে আমদানি শুল্ক প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে সংগঠনটি।
মন্তব্য করুন