
ঢাকা: বাংলাদেশের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলীয় ছাত্ররাজনীতির নামে চলমান সংঘাত, সহিংসতা এবং উচ্চশিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হওয়ার বিষয়টি দীর্ঘদিনের আলোচিত সমস্যা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রসংগঠনগুলোর কর্মকাণ্ড এবং ছাত্র সংসদ নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে সচেতন মহল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তারিক মনজুরের সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, ছাত্ররাজনীতি এবং ছাত্রসংগঠনভিত্তিক দলীয় রাজনীতি কোনোভাবেই এক বিষয় নয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরও ক্যাম্পাসে সহনশীল পরিবেশের ঘাটতি এবং দলীয় আধিপত্য বিস্তারের প্রবণতা উচ্চশিক্ষার মানকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্ররাজনীতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আশির দশক থেকেই দলীয় ছাত্রসংগঠনগুলো আবাসিক হল দখল, অস্ত্রবাজি এবং নিজেদের মধ্যে সংঘাতে লিপ্ত রয়েছে। যখন যে দল ক্ষমতায় এসেছে, তাদের অনুগত ছাত্রসংগঠন ক্যাম্পাসে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। এর ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিপীড়ন, চাঁদাবাজি এবং টেন্ডারবাজির মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বেড়েছে। এমনকি শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগেও রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনগুলোর পরোক্ষ প্রভাব লক্ষ করা যায়, যা প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের মতে, রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠনগুলো ক্যাম্পাসে বিভেদ ও প্রতিহিংসার বীজ বুনে দেয়। এ বিষয়ে অধ্যাপক তারিক মনজুর তাঁর বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলীয় রাজনীতির প্রভাব কমানো না গেলে সামগ্রিক শিক্ষার পরিবেশ ফেরানো সম্ভব নয়।
ছাত্ররাজনীতি যদি ছাত্র সংসদকে কেন্দ্র করে হয়, তবে কারও আপত্তি থাকার কথা নয়। রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠনগুলো শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে বিভেদ ও প্রতিহিংসার বীজ বুনে দেয়, তা প্রকারান্তরে ভবিষ্যতের রাজনীতির সুস্থ ধারাকেই বাধাগ্রস্ত করে।
শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা এবং সহশিক্ষামূলক কার্যক্রম সচল রাখার জন্য রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠনের কোনো প্রয়োজন নেই বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এর পরিবর্তে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন চালুর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়মিত হলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে প্রকৃত নেতৃত্ব উঠে আসে এবং রাজনৈতিক দলের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ এড়ানো সম্ভব হয়। পাশাপাশি, শিক্ষক রাজনীতি বন্ধ না হলে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দলীয় প্রভাব পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয় বলেও মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন দেশের উদাহরণ টেনে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ছাত্রদের সরাসরি দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত রাখার পরিবর্তে জাতীয় দুর্যোগ বা সমাজসেবামূলক কাজে প্রশিক্ষিত করে তোলার মাধ্যমে গঠনমূলক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত শিক্ষাজীবন শেষ না হওয়া পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের দলীয় সদস্যপদ প্রদানে বিরত থাকা এবং ন্যূনতম বয়সসীমা নির্ধারণ করে দেওয়া। পরিশেষে, ছাত্রসংগঠনকে পৃষ্ঠপোষকতা না করে উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে মনোনিবেশ করাই সরকারের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
মন্তব্য করুন
ব্রেকিং নিউজ ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের তাৎক্ষণিক আপডেট পেতে নোটিফিকেশন অন করুন।