ইসলামী ইতিহাসের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র ইমাম আহমদ বিন হাম্বল শায়বানি। আব্বাসীয় রাজদরবারে যখন যুক্তিবাদী মুতাজিলা মতবাদের একচ্ছত্র আধিপত্য এবং খলিফাদের পৃষ্ঠপোষকতায় কোরআন সৃষ্টি হওয়া না হওয়া নিয়ে চরম বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসন চলছিল, তখন একাই অটল পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। এই সংকট ইতিহাসে ‘মিহনাতু খালকিল কোরআন’ নামে পরিচিত।
মুতাজিলা মতবাদের বিপরীতে অটল অবস্থান খলিফা মামুনের শাসনামলে রাষ্ট্রশক্তি ব্যবহার করে মুতাজিলাদের মতবাদ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। যারা কোরআনকে ‘সৃষ্ট’ বলে স্বীকার করেনি, তাদের ওপর নেমে এসেছিল রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন। ইমাম আহমদ বিন হাম্বল এই জুলুমের সামনে ছিলেন আপসহীন। দিনের পর দিন কারাবাস ও অমানুষিক নির্যাতনের পরেও তিনি তার আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। অনেক ঐতিহাসিক ইসলামের মূল ভিত্তি রক্ষায় তার এই অবদানকে ধর্মত্যাগীদের দমনে প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর সিদ্দিকের ভূমিকার সাথে তুলনা করেছেন।
শিক্ষা ও জ্ঞান সাধনা ১৬৪ হিজরিতে বাগদাদে জন্মগ্রহণকারী ইমাম আহমদ ছোটবেলা থেকেই জ্ঞান সাধনায় নিমগ্ন ছিলেন। হিজাজ, ইয়েমেন, বসরা ও কুফায় সফর করে তিনি সে সময়ের বিখ্যাত হাদিস বিশারদ ও ফকিহদের সান্নিধ্য লাভ করেন। চল্লিশ বছর বয়সে বাগদাদের কেন্দ্রীয় মসজিদে তার পাঠদান শুরু হয়, যেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার শিক্ষার্থী সমবেত হতেন। হাদিস বর্ণনায় তার সতর্কতা ও বিনয় ছিল সর্বজনবিদিত।
হাম্বলি মাযহাবের ভিত্তি ইমাম আহমদ নিজে চাননি তার নামে কোনো মাযহাব গড়ে উঠুক, বরং তিনি ছাত্রদের সর্বদা কোরআন ও সুন্নাহর সরাসরি অনুসরণের দীক্ষা দিতেন। তার ফতোয়া ও ছাত্রদের সংকলিত পাণ্ডুলিপির ভিত্তিতেই পরবর্তীতে হাম্বলি মাযহাবের আত্মপ্রকাশ ঘটে। এই মাযহাবের মূল ভিত্তিগুলো হলো:
কোরআন ও সুন্নাহর অকাট্য দলিল অনুসরণ।
সাহাবীদের ইজমা বা সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের প্রতি আনুগত্য।
সাহাবীদের মতভেদের ক্ষেত্রে কোরআন-সুন্নাহর নিকটতম মত গ্রহণ।
প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে কিয়াস বা অনুমানের ব্যবহার।
শেষ জীবন ও উত্তরণ দীর্ঘদিনের কারাবাস ও অমানুষিক নির্যাতনের ধকল তার শরীরে স্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল। খলিফা মুতাওয়াক্কিল ক্ষমতায় এসে এই বুদ্ধিবৃত্তিক নির্যাতনের অবসান ঘটালে তিনি মুক্ত হন। তবে কারাগারের সেই নির্যাতনের প্রভাবে অবশেষে ২৪১ হিজরিতে ৭৭ বছর বয়সে বাগদাদে এই মহান মনীষী ইন্তেকাল করেন। তিনি রেখে যান হাদিসের বিশাল ভাণ্ডার ‘আল-মুসনাদ’। শাসকের জুলুমের বিরুদ্ধে আদর্শিক লড়াইয়ের অমর প্রতীক হিসেবে তিনি মুসলিম ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।
মন্তব্য করুন