
গত ১০ অক্টোবর ভারতের রাজধানী দিল্লির রাজপথের দৃশ্য ও প্রশাসনিক তৎপরতা থেকে এটি স্পষ্ট যে, বর্তমান ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সরকার ভিন্নমত ও জনগণের প্রতিবাদ নিয়ে চরম আঙ্কের মধ্যে রয়েছে। দিল্লির বিভিন্ন রাস্তার প্রবেশমুখে ভারী ব্যারিকেড এবং শত শত পুলিশের সজাগ দৃষ্টির কারণে সাধারণ মানুষের চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। রাস্তাঘাটে পথচারী মাত্রই সরকারের চোখে সন্দেহভাজনে পরিণত হয় এবং বিভিন্ন স্থানে নাগরিকদের জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়তে হয়। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় ও এর আশেপাশের এলাকায় শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষকে আটকের ঘটনা ঘটে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় দিল্লিকে কার্যত একটি সেনাছাউনিতে রূপান্তর করা হয়। পশ্চিমবঙ্গ, জম্মু-কাশ্মীর ও ছত্তিশগড় থেকে রিজার্ভ পুলিশ উড়িয়ে আনার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর ২২১টি কোম্পানি দিল্লি পুলিশের হাতে ন্যস্ত করা হয়। বিক্ষোভ দমনে প্রায় ১০টি আটককেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়। ওলা ও উবারের মতো ক্যাব পরিষেবা বন্ধ রাখতে বলা হয়, হোটেলগুলোতে অতিথি তোলায় নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়, শহরের প্রধান দুটি রেলওয়ে স্টেশন এবং ৫৭টি মেট্রোস্টেশন বন্ধ রাখা হয়। এছাড়া দিল্লির বড় এলাকাজুড়ে ইন্টারনেট সেবা স্থগিত করে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস অনলাইনে নিতে বাধ্য করা হয়।
এই কঠোর পরিস্থিতি ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে নাগরিক সমাজ ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। প্রখ্যাত লেখিকা নয়ানতারা সেহগালের কন্যা গীতা সেহগালসহ বিশিষ্টজনেরা দিল্লির এই দমনপীড়নের তীব্র সমালোচনা করেন। সরকার ও প্রশাসনের এমন নজিরবিহীন পদক্ষেপের বিষয়ে বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলেছেন যে, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকারকে এভাবে নস্যাৎ করা কতটা যৌক্তিক। সমালোচকদের মতে, ক্ষমতাসীনরা রাজনৈতিক ভিন্নমতকে ভয় পাচ্ছে বলেই গোটা শহরকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে।
নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ও চলাচলের স্বাধীনতার প্রশ্নটি আদালতের দ্বারস্থ হলেও সেখানেও মিলছে না স্বস্তি। মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। হেবিয়াস করপাস পিটিশনের শুনানিতে আদালতের কিছু পর্যবেক্ষণ ও পুরো দিল্লিকে অবরুদ্ধ রাখাকে যৌক্তিক হিসেবে তুলে ধরার ঘটনা নাগরিক অধিকারের পরিসরকে সংকুচিত করেছে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। কোনো সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই নাগরিকদের আটকে রাখা এবং আদালতের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক আইনি সুরক্ষা না পাওয়া বিচার ব্যবস্থার বর্তমান বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তোলে।
সব বাধা ও পুলিশি পাহারা উপেক্ষা করে দিল্লির রাজপথে বিভিন্ন স্থানে ভিন্নমতের সুর ও প্রতিবাদের আবহ বজায় ছিল। কস্তুরবা গান্ধী মার্গ ও প্রেসক্লাব চত্বরে সাংবাদিক, রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে দমনপীড়ন চালিয়েও প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর পুরোপুরি রোধ করা সম্ভব নয়। সরকার হয়তো যন্তর মন্তরকে একটি নীরব এলাকায় পরিণত করতে সফল হয়েছে, তবে এই নীরবতার অন্তরালে লুকিয়ে থাকা জনরোষ ও আতঙ্কই এখন মোদি সরকারের মাথাব্যথার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মন্তব্য করুন
ব্রেকিং নিউজ ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের তাৎক্ষণিক আপডেট পেতে নোটিফিকেশন অন করুন।