
পরিবেশ অধিদপ্তরের নথিতে নদীদূষণ এবং পরিবেশ আইন ভঙ্গের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকার পরও মানিকগঞ্জের আকিজ টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড ও তারাসিমা অ্যাপারেলস লিমিটেড শ্রম মন্ত্রণালয়ের মর্যাদাপূর্ণ গ্রিন ফ্যাক্টরি অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেছে। পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ও টেকসই শিল্পচর্চাকে উৎসাহিত করতে ২০২৫ সালে এই পুরস্কার দেওয়া হলেও, অভিযুক্ত কারখানাগুলোর বিরুদ্ধে অতীতে নেওয়া আইনি পদক্ষেপ বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিষয়টি মূল্যায়নের সময় সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ধলেশ্বরী নদীদূষণের অভিযোগে আকিজ টেক্সটাইল মিলসকে ২০২৩ ও ২০২৪ সালে একাধিকবার কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের মার্চে পরিবেশ ও প্রতিবেশগত ক্ষতিসাধনের দায়ে প্রতিষ্ঠানটিকে ৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। অন্যদিকে, গাজীখালী নদী দূষণের অভিযোগে তারাসিমা অ্যাপারেলস লিমিটেডের বিরুদ্ধেও একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। স্থানীয় কৃষক ও পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, নদীর পানি ও কৃষিজমির অপূরণীয় ক্ষতিসাধনকারী এসব প্রতিষ্ঠানকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিবেশবান্ধব স্বীকৃতি দেওয়া অত্যন্ত হতাশাজনক।
“নদীকে দূষিত করে পরিবেশ অধিদপ্তরের নোটিশ খেয়েও যদি গ্রিন ফ্যাক্টরি অ্যাওয়ার্ড পাওয়া যায়, তাহলে বাকিরাও নিশ্চয়ই নদীদূষণে আগ্রহী হবে বা বেপরোয়া হয়ে উঠবে। পরিবেশ অধিদপ্তরের নোটিশ দুটির পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়েছে, তা অবিলম্বে খতিয়ে দেখা দরকার।” - শেখ রোকন, মহাসচিব, রিভারাইন পিপল
পুরস্কার প্রদান প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) মানিকগঞ্জ জেলা শাখার সিনিয়র সহ-সভাপতি ইকবাল হোসেন কচি বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে দূষণের সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকার পরও তা কেন মূল্যায়ন কমিটিতে জানানো হয়নি, সেটি তদন্ত করে দেখা উচিত। তবে তারাসিমা অ্যাপারেলসের কমপ্লায়েন্স কর্মকর্তা কামরুজ্জামান দাবি করেছেন, অতীতের নোটিশের যথাযথ জবাব দেওয়া হয়েছে এবং তাদের কারখানা সরকারি নিয়ম মেনেই পরিচালিত হচ্ছে। অন্যদিকে, আকিজ টেক্সটাইল মিলসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে দূষণ নিয়ন্ত্রণে তাদের পক্ষ থেকে কারিগরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।
পুরস্কারের জন্য গঠিত মূল্যায়ন কমিটির সদস্য ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বক্তব্যেও অসঙ্গতি লক্ষ্য করা গেছে। শ্রম মন্ত্রণালয় গঠিত কোর কমিটির সদস্য এবং তৎকালীন পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মুনিরা সুলতানা দাবি করেছেন যে তিনি শুধুমাত্র শেষ সভায় উপস্থিত ছিলেন এবং কমিটির অন্য সদস্যরা সবকিছু নির্ধারণ করেছেন। এমনকি কমিটিতে পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিনিধি হিসেবে যার নাম ছিল, সেই উপ-পরিচালক মো. আখতারুজ্জামান টুকু জানিয়েছেন যে তিনি ওই সময়ে অবসরে ছিলেন এবং এই বিষয়ে তার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।
পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. লুৎফর রহমান জানিয়েছেন যে এ ধরনের অনিয়মের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ও লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে যথাযথ তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হবে। তবে নদীর মতো প্রাকৃতিক সম্পদ দূষণকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে গ্রিন ফ্যাক্টরি হিসেবে পুরস্কৃত করার ঘটনাটি দেশের সার্বিক পরিবেশ সংরক্ষণের প্রচেষ্টাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে এবং সচেতন মহলে তীব্র নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।
মন্তব্য করুন
ব্রেকিং নিউজ ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের তাৎক্ষণিক আপডেট পেতে নোটিফিকেশন অন করুন।